পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার পর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে চীন। সংঘাত অবসানে ‘সংলাপ ও আলোচনার’ আহ্বান জানিয়ে বেইজিং স্পষ্ট করেছে যে তারা পরিস্থিতিকে আর জটিল হতে দিতে চায় না। একই সঙ্গে পাকিস্তান–আফগানিস্তান ইস্যুতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় আসার ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা।
সাম্প্রতিক সীমান্ত হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে। আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা পাকিস্তানের একাধিক সীমান্ত চৌকি ধ্বংস করেছে। বহু সেনা হতাহত হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামাবাদ দাবি করছে, তারা আফগান তালেবান ঘাঁটিতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যু আর ডুরান্ড লাইনের দীর্ঘদিনের বিরোধ। পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে টিটিপি তাদের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে। কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ক্রমেই বেড়েছে।
চীন শুরু থেকেই সরাসরি সামরিক অবস্থান নেয়নি। বরং তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দুই দেশকে সংযম দেখাতে হবে।উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক পথই একমাত্র সমাধান। তবে এই অবস্থান শুধু নীতিগত নয়, গভীর কৌশলগতও। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র, বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসি (সি-পিই-সি) তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই (বি-আর-আই)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা মানে এই বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়া। আবার আফগানিস্তানেও চীনের খনিজ ও অবকাঠামোগত আগ্রহ রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বেইজিংয়ের আঞ্চলিক স্বার্থের পরিপন্থী।
চীন ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। অতীতে চীন আফগানিস্তান ইস্যুতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজন করেছে। এবারও সেই কাঠামো সক্রিয় হতে পারে। সম্ভাব্য কৌশলের মধ্যে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ আয়োজন, সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো প্রস্তাব আর অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে দুই পক্ষকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে উৎসাহিত করা। বেইজিং বা ইসলামাবাদে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ডেকে সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন ও সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় জোরদার করার রূপরেখা তৈরি করা হতে পারে।
এই সংঘাত ঘিরে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোও সক্রিয় হয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। আঙ্কারা ঐতিহাসিকভাবে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং কাবুলের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রেখেছে। সৌদি আবর পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। অতীতে আফগানিস্তান প্রশ্নে রিয়াদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। আফগানিস্তানের প্রতিবেশী হিসেবে ইরান সরাসরি প্রভাবিত হয় সীমান্ত নিরাপত্তা ও শরণার্থী ইস্যুতে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। জমিয়াত উলেমা-ই-ইসলামের (এফ) প্রধান ফজলুর রেহমান বলেছেন, পাকিস্তানের অভিযোগ বৈধ হতে পারে, তবে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতিও শ্রদ্ধা জরুরি। এই মন্তব্য একদিকে সরকারের নিরাপত্তা উদ্বেগকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বলেছেন, আফগানরা তাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে। তার এই বক্তব্য জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিতে পারে, যা কাবুলের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। পাকিস্তান টিটিপি ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আর আফগান তালেবান সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্যেও রয়েছে। সীমান্ত বিরোধ ঐতিহাসিক ও আবেগঘন হওয়ায় দ্রুত সমাধান সহজ নয়। তবুও বেইজিংয়ের একটি বড় সুবিধা হলো- দুই দেশের সঙ্গেই তাদের কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে। তারা প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেয়নি। এই নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিই মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে তাদের শক্তি।
চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাস, যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সূচনা কিংবা টিটিপি ইস্যুতে নতুন সমঝোতা কাঠামো তৈরি হতে পারে। ব্যর্থ হলে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় রূপ নিতে পারে। যার প্রভাব শুধু দুই দেশেই নয়, সমগ্র দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় পড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাক–আফগান সংঘাতে চীন সরাসরি সামরিক পথ নয়, কূটনৈতিক ভারসাম্যের কৌশল বেছে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য একদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা। এখন দেখার বিষয়- বেইজিং কি বাস্তবেই দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারে, নাকি সীমান্তের উত্তেজনা আরও বিস্তৃত আকার নেবে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী সময়ের সমীকরণ।
সারাদেশ: ড্রাম ট্রাকে গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত
আন্তর্জাতিক: পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পাক-আফগান উত্তেজনা