ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাকে ঘিরে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে রাশিয়া। মস্কোর অভিযোগ, ওয়াশিংটন কূটনৈতিক আলোচনাকে ‘আড়াল’ হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। রাশিয়ার এই প্রতিক্রিয়া শুধু তাৎক্ষণিক নিন্দা নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ- যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার সামনে চলে এসেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেদভেদেভ অভিযোগ করেন- সামরিক অভিযান চালানোর আগে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে পারমাণবিক আলোচনা চলছিল, তা ছিল কেবল একটি ‘ছলচাতুরি’। টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘শান্তির দূত আবারও তার আসল চেহারা দেখিয়েছে।’ তার দাবি, ইরানের সঙ্গে সব আলোচনা ছিল একটি আড়াল মাত্র, প্রকৃতপক্ষে কোনো পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী ছিল না।
মেদভেদেভের এই বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মত নয়; এটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক চরম পর্যায়ের উত্তেজনায় রয়েছে। এর মধ্যে ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে মস্কো সরাসরি ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ আচরণ হিসেবে তুলে ধরছে। রাশিয়ার বার্তা স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগকে তারা বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না।
ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা, জ্বালানি খাতে সমন্বয় এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় পারস্পরিক সমর্থন- সব মিলিয়ে তেহরান ও মস্কো এখন অনেকটাই একই কৌশলগত অক্ষের অংশ। ফলে ইরানের ওপর হামলা রাশিয়ার কাছে কেবল একটি আঞ্চলিক ঘটনা নয়, বরং তাদের প্রভাববলয়ের ওপরও আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে দুইভাবে কাজে লাগাতে চাইতে পারে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘দ্বৈত নীতি’র অভিযুক্ত করে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখা। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব আরও জোরদার করা। সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক- এই দুই উপাদান রাশিয়াকে এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
মেদভেদেভের বক্তব্যে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে, তা হলো কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা। যদি সত্যিই আলোচনার মধ্যেই হামলা চালানো হয়ে থাকে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। কারণ এতে ভবিষ্যৎ আলোচনাগুলোর ওপর আস্থা কমে যেতে পারে। রাশিয়া এই যুক্তিটিই সামনে আনছে—তাদের মতে, সমঝোতার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি নেওয়া আন্তর্জাতিক নীতির পরিপন্থী।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো রাশিয়ার এই অভিযোগের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। ওয়াশিংটনের অবস্থান সাধারণত এমন যে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা ও মিত্রদের সুরক্ষার স্বার্থে পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু রাশিয়া এটিকে আগ্রাসী নীতি হিসেবে তুলে ধরছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার এই কড়া প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সমীকরণ, অন্যদিকে রাশিয়া–যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। যদি উত্তেজনা আরও বাড়ে, তাহলে তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ক্ষোভ শুধু একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি বৃহত্তর শক্তির রাজনীতির অংশ। মস্কো স্পষ্টতই বার্তা দিতে চাইছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপকে তারা নজরে রাখছে এবং সুযোগ পেলেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার সমালোচনা করবে। এখন দেখার বিষয়, এই বাকযুদ্ধ কূটনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বৃহত্তর শক্তির দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করে।
আন্তর্জাতিক: ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও বিপ্লবী গার্ড প্রধান নিহত
আন্তর্জাতিক: পরাশক্তির ইন্ধনে ভয়াবহ যুদ্ধে এশিয়া-ইউরোপ
অর্থ-বাণিজ্য: বাজার মূলধন বাড়লো ৮ হাজার কোটি টাকা
অর্থ-বাণিজ্য: জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না
অর্থ-বাণিজ্য: সোনার দাম ফের বাড়লো