image

ইরানের হাল ধরতে যাওয়া কে এই লারিজানি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিমান হামলায় নিহত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন আলী লারিজানি। রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি জানিয়েছেন, দেশে একটি ‘অস্থায়ী পরিচালনা পরিষদ’ গঠন করা হবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে- নেতৃত্বের শূন্যতায় ইরানের হাল ধরতে এগিয়ে আসছেন অভিজ্ঞ এই নীতিনির্ধারক।

গত এক বছরে লারিজানি ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এসএনএসসি)-এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি খামেনির বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিতি পান। পারমাণবিক আলোচনা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাম্প্রতিক ভাষণে লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। এ বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তিনি।

লারিজানির রাজনৈতিক পরিচয় বহুমাত্রিক। ১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া এই নেতা ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর ভাইয়েরাও বিচার বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাসনব্যবস্থার ভেতরের মানুষ হিসেবে শুরু থেকেই তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি ছিলেন।

তিনি একসময় রেভোল্যুশনারি গার্ডের সদস্য ছিলেন। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রধান পরমাণু আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত লারিজানি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রস্তাবকে একবার তুলনা করেছিলেন ‘একটি মুক্তার বদলে ক্যান্ডি বার নেওয়া’র সঙ্গে।

২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন তিনি। তাঁর সময়েই ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়, তবু আলোচনাপ্রক্রিয়ায় লারিজানির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

পারমাণবিক ইস্যুতে তাঁকে অনেকেই বাস্তববাদী মনে করেন। সম্প্রতি ওমানি টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ যদি কেবল ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা নিয়ে হয়, তবে সে বিষয়ে আলোচনা সম্ভব। এই অবস্থান তাঁকে কট্টরপন্থী ও বাস্তববাদী—দুই ধারার মধ্যবর্তী একটি সেতুতে দাঁড় করিয়েছে।

তবে তাঁর ক্যারিয়ার বিতর্কমুক্ত নয়। গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সেই বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হন। লারিজানি বিক্ষোভকে ‘জনগণের প্রতিবাদ’ হিসেবে স্বীকার করলেও সশস্ত্র অংশগ্রহণকারীদের ‘শহুরে আধা সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অযোগ্য ঘোষণা করে। তবু নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে তাঁর প্রভাব কমেনি। বরং সংকটময় মুহূর্তে তিনি নিজেকে একজন দক্ষ ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

খামেনির অনুপস্থিতিতে ইরান এখন এক সন্ধিক্ষণে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ- সব মিলিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দেশটি। এই বাস্তবতায় আলী লারিজানি কেবল অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের মুখ নন; বরং ইরানের ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠতে পারেন।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি