image

বিশ্লেষণ

ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কী কী লাভ

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।স্যাটেলাইটের ছবিতে সর্বোচ্চ নেতার কম্পাউন্ডকে ধূসর ধুলা ও ছাইয়ের স্তূপ হিসেবে দেখা যায়।যদিও ইরানি সংবাদ সংস্থাগুলো দাবি করে, খামেনি অজ্ঞাত স্থানে নিরাপদে আছেন।প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও অক্ষত রয়েছেন।

অথচ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, খামেনি নিহত হয়েছেন। সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে আয়াতুল্লাহ নিহত হয়েছেন। যে ঘটনা ইঙ্গিত করে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইয়ের লক্ষ্যবস্তু শুধু বর্তমান নেতৃত্বই ছিল না। তেহরানে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বাসভবনও ধ্বংস করা হয়। তাঁর পরিণতি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এখন প্রশ্ন, এসব করে কী লাভ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের।এত ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর উদ্দেশ্য কী? দ্য গার্ডিয়ান-এর জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা জুলিয়ান বর্গার বলছেন, তৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা যদি রেজিম চেঞ্জের (সরকার পরিবর্তন) উদ্দেশ্যের যথেষ্ট প্রমাণ না হয়, তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ফারসি ভাষায় টুইট করে বিদ্রোহের যে আহ্বান জানায়, তাতে সেটা স্পষ্ট। বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের ইরানি ভাই ও বোনেরা, আপনারা একা নন! আমরা আপনাদের জন্য একটি বিশেষ, অতি সুরক্ষিত টেলিগ্রাম চ্যানেল চালু করেছি।’

মোসাদের টুইটে আরও বলা হয়, ‘আমরা একসঙ্গে ইরানকে তার গৌরবময় দিনে ফিরিয়ে নেব। সরকারের বিরুদ্ধে আপনাদের ন্যায্য সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নিজেদের খেয়াল রাখুন! আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ সরকার উৎখাতে ইরানিদের আহ্বান জানানো মোসাদের ভাষা ডোনাল্ড ট্রাম্পও পুনরাবৃত্তি করেন। ফলে ইরানে হামলা থেকে যেসব লাভ ঘরে তুলবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা স্পষ্ট।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস

হামলার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ধ্বংস করতে চায়। ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বোমারু বিমান ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করার পরও, গোয়েন্দা তথ্য বলছে ইরান সেগুলো পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছিল। এই হামলা সেই প্রচেষ্টাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস

ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে ‘মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার’ আর তাদের নৌবাহিনীকে ‘ধ্বংস করার’ অঙ্গীকার করেছেন। ইসরায়েলের জন্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করা গেলে ইরানের ইসরায়েল ও এই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে।

প্রক্সি যোদ্ধাদের দুর্বল করা

ইরান দীর্ঘদিন ধরে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাসসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে, যা ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ নামে পরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ইরানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক শক্তি ধ্বংস করতে পারলে এই প্রক্সিরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।এই অঞ্চলে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের ওপর হুমকি কমে আসবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর, ইসরায়েল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে শত্রুকে শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধের কৌশলে আটকে রাখা সম্ভব নয়।

শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন

এই অভিযানের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো ইরানের বর্তমান ইসলামি শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটানো। মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতারা প্রকাশ্যেই ইরানের জনগণকে তাদের শাসকের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর, এই লক্ষ্য অর্জনের পথ অনেকটাই পরিষ্কার বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।আরটিই-এর বিশ্লেষক এডমন্ড হিপির মতে, এটি একটি প্রকাশ্য ও স্পষ্ট শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ।

একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য গঠন

হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে এই অভিযানকে ‘এক প্রজন্মে একবার আসা সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থে এই অঞ্চলে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। ইসরায়েলের পরিপ্রেক্ষিতে, ইরানের চূড়ান্ত পরাজয় ইব্রাহিম অ্যাকর্ডের ভিত্তিতে সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের পথ প্রশস্ত করতে পারে।এমনকি সিরিয়া ও লেবাননের সাথেও নতুন চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

প্রতিরোধ সক্ষমতা পুনরুদ্ধার

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা এবং তার পরবর্তী যুদ্ধের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে, ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান ইসরায়েলের প্রতিরোধ সক্ষমতা ও আঞ্চলিক অবস্থান ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি