ইরান-ইসরায়েল সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি। যুদ্ধের বিস্তার ইরান ও ইসরায়েলের সীমানা ছাড়িয়ে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে- মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কতটা নিরাপদ?
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে লেবানন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত ও ইরাকে দায়িত্বরত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসীদের সামরিক স্থাপনা থেকে দূরে থাকা, অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়া, গুজব এড়িয়ে চলা এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাসপোর্ট, স্থানীয় আইডি, স্বাস্থ্য কার্ড, নগদ অর্থ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, শুকনো খাবার, পানি ও মোবাইল চার্জার হাতের কাছে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্দেশনা মেনে চলার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও আবুধাবিতে বিস্ফোরণের খবর এসেছে। কিছু ঘটনায় প্রাণহানির তথ্যও মিলেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ দেশের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে বিঘ্নিত থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রভিত্তিক হামলার বিস্তৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঝুঁকি কেবল সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; সামরিক ঘাঁটি বা কৌশলগত স্থাপনার আশপাশেও নিরাপত্তা শঙ্কা বাড়ছে। ইরানে শিক্ষার্থীসহ কয়েক শ বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। তাঁদের পরিবার-স্বজনরা দেশে উৎকণ্ঠায় সময় কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। মোট অভিবাসীর প্রায় ৬৭ শতাংশই কাজ করেন সৌদি আরবে। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মস্থল অচল হয়ে পড়া, ছুটি শেষে কর্মীরা ফিরে যেতে না পারা কিংবা নতুন নিয়োগ স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ও তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়- এই দুই খাতই দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়েও রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে দেশে রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এই প্রবাহে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকার ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সহায়তায় প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে বাস্তবতা হলো, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে শুধু কূটনৈতিক প্রস্তুতি যথেষ্ট নাও হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দাবি করছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা নেওয়াও জরুরি হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের বিস্তার কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখনো অনিশ্চিত। আর সেই অনিশ্চয়তার মাঝেই প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে- মধ্যপ্রাচ্যে থাকা লাখো বাংলাদেশি কতটা সুরক্ষিত?
সারাদেশ: সুনামগঞ্জে সার বিক্রেতাদের মানববন্ধন
অর্থ-বাণিজ্য: মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেশের রপ্তানি খাতে নতুন হুমকি
অর্থ-বাণিজ্য: দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পচে যাচ্ছে পণ্য