বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডর হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা ‘জ্বালিয়ে’ দেওয়া হবে—এমন হুমকিও দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সব ধরনের নৌযানের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেন, ‘প্রণালি এখন বন্ধ। কোনো জাহাজ প্রবেশের চেষ্টা করলে বিপ্লবী রক্ষী ও নৌবাহিনী সেগুলো পুড়িয়ে দেবে।’ রয়টার্স জানিয়েছে, সোমবার বিপ্লবী বাহিনীর কমান্ডারের এক উপদেষ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় ধাক্কা লাগে। সেই প্রেক্ষাপটে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে তেহরানের এ পদক্ষেপকে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে বহন করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩১ শতাংশ ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান- এই দেশগুলো মূলত এ পথেই এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে তেল-গ্যাস রপ্তানি করে। সবচেয়ে অপ্রশস্ত স্থানে প্রণালিটির প্রস্থ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার, যা এটিকে সামরিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ন্যুবার্জার বেরমানের জ্যেষ্ঠ পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া বলেন, “এই সিদ্ধান্তের প্রভাবকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।” তাঁর মতে, এক-দুই সপ্তাহ আংশিক বন্ধ থাকলে বড় তেল কোম্পানিগুলো সামাল দিতে পারবে। তবে এক মাস বা তার বেশি সময় প্রণালি বন্ধ থাকলে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা ১০০ ডলার ছুঁতে পারে। এর প্রভাব পড়বে ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে রপ্তানি হওয়া জ্বালানির বেশিরভাগের জন্য কার্যকর বিকল্প পথ নেই। যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সীমিত পরিসরে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করতে পারে, তা মোট সরবরাহের তুলনায় অপ্রতুল।
এদিকে তথ্য-বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, প্রণালিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবে সেখানে তেলের ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুক্তরাজ্যের নৌ-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র একাধিক জাহাজে হামলার তথ্য দিয়েছে। ওমান উপসাগরে একটি নৌ-ড্রোন হামলায় মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি ট্যাংকারে আগুন ধরে যায় এবং অন্তত একজন নাবিক নিহত হন।
ইতিহাস বলছে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিলেই বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে ধাক্কা লাগে। গত বছর ইসরায়েল-ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও তেলের দামে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল। এবার পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতির পরবর্তী ধাক্কার মাত্রা। আপাতত জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তার মেঘ ঘন হচ্ছে।