ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
বাড়ছে মৃত্যু
চারদিনে আক্রান্ত মধ্যপ্রাচ্যের ১২ দেশ
অন্তত ১৫৩ শহরে হামলা
তেহরানে দফায় দফায় তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানও। এরই মধ্যে খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এরপর লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইরানে গত শনিবার হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার, (০৩ মার্চ ২০২৬) ছিল যুদ্ধের ৪র্থ দিন। মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও, অর্থাৎ প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট। তবে সবমিলিয়ে হামলায় নিহত হয়েছে ৭৮৭ জন। যুদ্ধে কমপক্ষে ১৫৩টি শহরে হামলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আঘাত হেনেছে ৫০৪ স্থানে, দু’পক্ষর হামলার সংখ্যা এক হাজার ৩০৯টি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবন ও কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরানের হামলায় ইসরায়েলে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন চার মার্কিন সেনা।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের সংঘাতে জড়িয়েছিল ইরান ও ইসরায়েল। তাতে যোগ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রও। এবার ইসরায়েল আরও তীব্রতার সঙ্গে হামলা চালাচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র। এ যুদ্ধ ৪-৫ সপ্তাহ চলতে পারে বলে হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এ-ও বলেছেন যে দরকার পড়লে অভিযান আরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইরানে বিপুল মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে ইরান। দেশটির তাবরিজ শহরের বাসিন্দা মোর্তেজা সেগিদি রয়টার্সকে বলেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল) শিশুদের হত্যা করছে। হাসপাতালে হামলা চালাচ্ছে। এমন গণতন্ত্রই কি ট্রাম্প আমাদের দিতে চান?’
বিস্ফোরণে কাঁপছে তেহরান
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের চলমান অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। আর ইসরায়েল নাম দিয়েছে ‘লায়ন রোর’। গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ইরানের ১৩১টি শহরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানে ৯টি হাসপাতালে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের আইনপ্রণেতা ফাতেমেহ মোহাম্মদ বেগ। আইআরজিসির প্রধান কার্যালয়ও ধ্বংসের দাবি করেছে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। গত রোববার ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থায় (আইএইএ) নিযুক্ত ইরানের দূত রেজা নাজাফি। মঙ্গলবার দেশটির ইসফাহান পরমাণু স্থাপনার কাছেও বিস্ফোরণ ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত
গতকাল সোমবার কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানায়, দেশটিতে বেশ কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানগুলোর পরিণতি কেন এমন হলো তা জানায়নি কুয়েত সরকার। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে নিশ্চিত করা হয় তিনটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সেগুলো ‘এফ-১৫ ইগল’ মডেলের। ইরানে চলমান অভিযান এপিক ফিউরির অংশ হিসেবে সেগুলো আকাশে মোতায়েন করা হয়েছিল। কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভুল করে ছোড়া গুলিতেই যুদ্ধবিমানগুলো ভূপাতিত হয়েছে। তবে পাইলট ও ক্রু সদস্যরা জীবিত আছেন।
ইরানের হামলায় ৫ মার্কিন সেনা নিহতের খবর জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আহত হয়েছিলেন আরও পাঁচজন। ওই সেনারা কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে নিহত হন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন মার্কিন দুই কর্মকর্তা।
মধ্যপ্রাচ্যে দেশে দেশে বিস্ফোরণ-ক্ষয়ক্ষতি
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে হামলা জোরদার করেছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আবাস আসলানি আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের কাছে সহজ লক্ষ্যবস্তু। সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই এসব ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা বাড়তে পারে।
মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আরব আমিরাতের আবুধাবিতে জ্বালানি তেলের একটি ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে ইরানের একটি ড্রোন। হামলা হয়েছে সৌদি আরবেও। দেশটির পূর্বাঞ্চলে সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগার রাস তানুরা থেকে ধোঁয়ার বড় কু-লী উঠতে দেখা যায়। ইরানের ড্রোন হামলার পর ওই শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) এ তথ্য নিশ্চিত করে দেশজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে হামলা
মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধের আঁচ পড়েছে সাইপ্রাসেও। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোডোউলিয়াস জানান, গত রোববার রাতে সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটি ঘাঁটিতে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন আঘাত হেনেছে। এতে ঘাঁটিটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। পরে মঙ্গলবার ও ঘাঁটিটিতে হামলা সতর্কতায় সাইরেন শোনা যায়। সেখান থেকে উড়তে দেখা যায় ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান।
সাইপ্রাসে হামলার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন বলেছেন, ইরানের হামলাটি সাইপ্রাসকে উদ্দেশ্য করে না হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেবে।
যুদ্ধ ছড়িয়েছে লেবাননেও
মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানসমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে। এর একটি লেবাননের হিজবুল্লাহ। প্যালেস্টাইনের গাজায় আগ্রাসন চলাকালে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল গোষ্ঠীটি। সে সময় তারা অনেকটা দুর্বলও হয়ে পড়েছিল। এবার খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটিকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলও।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আকাশপথে হামলা চালিয়েছে তারা। এতে গোষ্ঠীটির গোয়েন্দাপ্রধান হুসেইন ম্যাকলেড নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে ৫২ জন নিহত ও ১৫৪ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বৈরুত। ইসারায়েলের বোমা হামলার মুখে পূর্ব লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠ থেকে সাড়ে ২৮ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
নাগরিকদের কয়েক দেশ এখনই ছাড়তে বললো যুক্তরাষ্ট্র
চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দেশ মার্কিনিদের এখনই ছাড়তে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ভেরিফায়েড ফেইসবুক ও এক্সে দেয়া পোস্টে এ কথা বলা হয়। দেশগুলো হলো- বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, ফ্যালেস্টাইন (পশ্চিমতীর ও গাজা), জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে। সেদিন ইরানের রাজধানী তেহরানে চালানো হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হন। জবাবে ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। পাশাপাশি তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত বছরের পর বছর ধরে টানার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের একটিই স্পষ্ট লক্ষ্য, ইরান যেন ‘কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র’ তৈরি করতে না পারে।
ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হবে না উল্লেখ করে ভ্যান্স বলেন, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প এই দেশকে কোনোভাবেই বহু বছরের দীর্ঘ কোনো সংঘাতে জড়াতে দেবেন না।’
ইরানের হামলায় কুয়েতে ৬ মার্কিন সেনা নিহত
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, কুয়েতের শুইবা বন্দরে ইরানের হামলায় নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে প্রথম মার্কিন সেনাদের মৃত্যু হয়েছে এক বেসামরিক বন্দরে। সেখানে অস্থায়ী একটি সামরিক অভিযান কেন্দ্রে সরাসরি আঘাত হানে ইরান। সেখানকার পরিস্থিতির বিষয়ে জ্ঞাত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা সিএনএনকে এমনটি জানিয়েছেন। গতকাল সোমবার বিকেলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক ঘোষণায় জানায়, কুয়েতের শুইবা বন্দরে হামলার ঘটনায় নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা বেড়ে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে। সিএনএন জানায়, আরও দুই মার্কিন সেনার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার পর সেন্ট্রাল কমান্ড এ ঘোষণা দেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, ‘একটি সুরক্ষিত কৌশলগত অভিযান কেন্দ্রে’ হামলার ঘটনায় ওই সেনারা নিহত হন। কেন্দ্রটি ‘সুরক্ষিত’ হওয়ার পরও ‘একটি’ প্রক্ষিপ্ত বস্তু এয়ার ডিফেন্স ভেদ করে সেখানে আঘাত হানে।
ইরান ‘গোটা মানবজাতির’ জন্য হুমকি হবে: নেতানিয়াহু
ইরানের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা যদি পারমাণবিক অস্ত্র এবং তা বহনের সক্ষমতা অর্জন করে, তবে তারা ‘পুরো মানবজাতির জন্য হুমকি’ হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল সোমবার বেইত শেমেশ পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য এই অভিযানে নেমেছি, তবে এটি করার মাধ্যমে আমরা আরও অনেককেই রক্ষা করছি।’
এ অভিযানে সহায়তার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকে বাঁচানোর এই মহৎ প্রচেষ্টায় আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য আমি আমাদের মহান বন্ধু এবং বিশ্বের এক মহান নেতা ডনাল্ড ট্রাম্পকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই।’