দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে এক আক্রমণাত্মক রূপ দিয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে নাটকীয়ভাবে অপহরণের পর ট্রাম্পের রণতরি এবার ভিড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরের উপকূলে। ‘মাদক সন্ত্রাস’ দমনের নামে শুরু হওয়া এই সামরিক হস্তক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক সংঘাতের জন্ম দিল।
ইকুয়েডরে যৌথ অভিযান: আড়ালে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য?
বুধবার মার্কিন ‘সাউদার্ন কমান্ড’ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, গত ৩ মার্চ থেকেই ইকুয়েডরের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান শুরু করেছে মার্কিন সেনারা। জেনারেল ফ্রান্সিস ডনোভান একে মাদক-সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে এক ‘শক্তিশালী উদাহরণ’ বলে দাবি করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা একে দেখছেন লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের নতুন কৌশল হিসেবে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গোলার্ধের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো আপস করবে না। ইতোমধ্যে নজরদারি ড্রোন ও সামরিক হেলিকপ্টারের মহড়া ইকুয়েডরের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
অপরাধ দমন না কি
সাজানো যুদ্ধ?
ট্রাম্পের নতুন ‘মিলিটারি ম্যানুয়াল’ অনুযায়ী, মাদক পাচার এখন আর সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি ‘যুদ্ধ’। তিনি বড় বড় মাদক কার্টেলগুলোকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। এর ফলে মার্কিন বাহিনী সরাসরি হামলা চালানোর আইনি সুযোগ (মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনে) পাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদকবাহী জলযানে অন্তত ৪৪টি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যাতে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। সমালোচকরা এই হত্যাকা-গুলোকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ হিসেবে দেখছেন। নিহতদের অনেকের পরিবার দাবি করেছে যে তারা সাধারণ মৎস্যজীবী ছিলেন।
ভেনেজুয়েলা থেকে ইকুয়েডর: ট্রাম্পের আগ্রাসী পদচিহ্ন
ইকুয়েডরের এই অভিযান বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। মাত্র দুই মাস আগে ৩ জানুয়ারির এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন কারাগারে বন্দি করা হয়েছে। জাতিসংঘ একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বললেও ট্রাম্প প্রশাসন তাতে কর্ণপাত করেনি। এখন ইকুয়েডরকে মাদক পাচারের ‘আদর্শ রুট’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানেও একই ধাঁচের অভিযান চালানো হচ্ছে।
কেন ইকুয়েডরকে বেছে
নেয়া হলো?
ইকুয়েডর একসময় লাতিন আমেরিকার ‘শান্তির দ্বীপ’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে কলম্বিয়া ও পেরুর কোকেন পাচারের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। দেশটির বর্তমান ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ট্রাম্পের ‘লোহার মুষ্টি’ (ওৎড়হ ঋরংঃ) নীতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। মেক্সিকো মার্কিন সেনাকে জায়গা দিতে রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প ইকুয়েডরকে তার সামরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ইরানের আকাশ থেকে ইকুয়েডরের সমুদ্র— ট্রাম্পের শাসনামলে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন সর্বত্র তৎপর। ‘মাদক নির্মূল’ বা ‘সন্ত্রাস দমন’ যে নামই দেওয়া হোক না কেন, এই নতুন যুদ্ধ-ফ্রন্ট বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে আলোচনার চেয়ে বারুদের গন্ধই এখন বেশি তীব্র।