মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি পাকিস্তানকে এক নজিরবিহীন কৌশলগত সংকটে ফেলেছে। একদিকে দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে সই করা সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে ধর্মীয় ও সীমান্ত সম্পর্ক; এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান যখন সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে, তখন পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সৌদি আরব সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে একটি কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। এই চুক্তির মূল ধারাটি অনেকটা ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর মতো, যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনও এক দেশের ওপর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সরাসরি এই চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। দার বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং আমি বিষয়টি ইরানকে জানিয়েছি।’ তার দাবি, কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই সৌদি আরব ও ওমানের ওপর ইরান তুলনামূলক কম হামলা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি ইসলামাবাদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের সহযোগী অধ্যাপক জাহিদ শাহাব আহমেদ বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সামরিক সহায়তা চাইতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে প্রস্তুত অবস্থায় থাকতে হবে, কারণ তারা সৌদি আরবকে সরাসরি না বলার অবস্থানে নেই।’
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা মনে করেন, সৌদি আরব এখনই সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। তারা পাকিস্তানকে মূলত একটি কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে ব্যবহার করছে যাতে তেহরানকে বার্তা দেওয়া যায় যে, রিয়াদ এই সংঘাতের অংশ নয়।
পাকিস্তানের জন্য এই সমীকরণে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমত। পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিয়া মুসলিম, যাদের ইরানের সঙ্গে গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে। খামেনি হত্যার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে করাচি ও ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন শহরে সহিংস বিক্ষোভে অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। শিয়া রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে পূর্ব সীমান্তে উত্তজনা এবং আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের কারণে পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বড় অংশই সেখানে ব্যস্ত। এমন অবস্থায় সৌদি আরবের সুরক্ষায় বড় কোনও সেনা মোতায়েন করা পাকিস্তানের জন্য হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানান্তর।
সব বাধা সত্ত্বেও সৌদি আরব পাকিস্তানের জন্য একটি ‘লাইফলাইন’। দেশটিতে কর্মরত ৪০ লাখের বেশি পাকিস্তানি বছরে কোটি কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। এ ছাড়া তেল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে রিয়াদ বারবার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করেছে। বুধবারও সৌদি কর্মকর্তারা লোহিত সাগর দিয়ে পাকিস্তানে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
উচ্চপর্যায়ের এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মানুষের আবেগ আমরা বুঝি, কিন্তু রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ীই কাজ করতে হবে।’ তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই রাজনীতিতে পক্ষ নেওয়া পাকিস্তানের জন্য ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে।
অর্থ-বাণিজ্য: ট্রাম্পের আদেশে নেয়া পাল্টা শুল্ক ফেরত দিতে হবে