মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এক চাঞ্চল্যকর মূল্যায়ন দিয়েছে। তাদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালেও তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই সামান্য। শনিবার ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের তৈরি করা ওই অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেও হত্যা করা হলেও দেশটির সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব বিদ্যমান উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে। ১৮টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে একাধিক বক্তব্যে দাবি করেছিলেন, তিনি চাইলে ইরানের নেতৃত্বকে সরিয়ে নিজের পছন্দের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকতে হবে। কিন্তু তার এই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান নিল যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত মতামত।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে। এতে সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেমন সীমিত হামলা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের আক্রমণ হলে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শাসনব্যবস্থায় এমন সুস্পষ্ট উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া বিদ্যমান যা নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হতে দেয় না। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের অস্থায়ী কাউন্সিল ক্ষমতা গ্রহণ করে। বর্তমানে এই কাউন্সিলের দায়িত্ব পালন করছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেইন মহসেনি-এজেহি এবং শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আলিরেজা আরাফি।
স্থায়ী উত্তরসূরি নির্বাচনের ক্ষমতা রয়েছে ৮৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ পরিষদের হাতে। এই পরিষদের সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হলেও তাদের মনোনয়ন চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেন সর্বোচ্চ নেতা নিজেই। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনির মতে, এটি ইরানি ব্যবস্থা এবং বহু বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াগুলোর একটি গভীরভাবে অবহিত মূল্যায়ন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিভক্ত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে পারবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান বা সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভাজনের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির মতো শক্তিশালী সংস্থাগুলো সংকটের সময়ে আরও সংহত হয়ে ওঠে। আইআরজিসি শুধু সামরিক বাহিনী নয়, এটি হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আমদানি-রপ্তানি কোম্পানি ও ব্যাংকও পরিচালনা করে। প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যার ইরানে আনুমানিক ১০ লাখ সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছে। আর প্রায় দেড় কোটি মানুষকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শগত সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আক্রমণের মধ্যে শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা ইরানের নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সাথে যুদ্ধের সময় থেকেই ইরান বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো তৈরি করেছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র খণ্ডিত কাঠামো হিসেবে কাজ করে, যেখানে বিভিন্ন অংশ একে অপরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই পরিচালিত হতে পারে। প্রাদেশিক গভর্নররা কেন্দ্রের সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বেসামরিক সেবা ও সামরিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে সক্ষম।
সর্বোচ্চ নেতার সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। খামেনির পুত্র মোজতাবা খামেনির নাম সামনে এলেও তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা রয়েছে। পশ্চিমা একটি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, আইআরজিসি মোজতাবার পক্ষে চেষ্টা চালালেও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি এর বিরোধিতা করছেন।
অস্থায়ী কাউন্সিলের সদস্য আলিরেজা আরাফি, রুহোল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা মোহাম্মদ-মেহদি মিরবাগেরির নামও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা এবং তাদের কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে বাধা দেওয়া।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন সহজেই ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলাতে পারবে এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরাক থেকে আফগানিস্তান ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত মার্কিন অভিযানগুলো সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করলেও সেগুলো ব্যয়বহল দখলদারিত্ব বা অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রতিবেদনে ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী মোতায়েন বা কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার মতো কৌশল বিশ্লেষণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে চলা জটিল সমীকরণের ওপর। এই সমীকরণে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের সীমাবদ্ধতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, আনাদোলু এজেন্সি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন
অপরাধ ও দুর্নীতি: শেখ হাসিনাসহ ৬ আসামির পক্ষে ‘স্টেইট ডিফেন্স’ নিয়োগের আবেদন প্রসিকিউশনের
আন্তর্জাতিক: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে কড়া ৩টি বার্তা দিল চীন
অর্থ-বাণিজ্য: উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দাম বাড়লো