image

ইরানে ঝরছে ভয়ঙ্কর কালো বৃষ্টি, কেন

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

তেহরানের আকাশ কালো হয়ে গেছে। সূর্যের আলো আটকে দিয়েছে ঘন, কালো মেঘ। আর সেই মেঘ থেকে ঝরছে অদ্ভুত কালো বৃষ্টি, যা পোড়া তেলের গন্ধে ভরা। স্পর্শ করলে হাতে দাগ লেগে যায়। শনিবার সিএনএনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরানের রাজধানীর রাস্তায় জমে আছে সেই কালো পানি, আর সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত।

কী এই কালো বৃষ্টি? কেন ইরানের আকাশে এমন ঘটনা ঘটছে? এর পেছনে রয়েছে আধুনিক যুদ্ধের এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক মাত্রা—শিল্প স্থাপনায় হামলা ও তার পরিবেশগত পরিণতি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল ইরানের সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ড্রোন কেন্দ্র। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই তালিকায় যুক্ত হয় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো—তেল শোধনাগার, জ্বালানি মজুত কেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শোধনাগার ও জ্বালানি ডিপোতে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। এই স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং কয়েক দিন ধরে জ্বলতে থাকে।

কালো বৃষ্টি আসলে বিজ্ঞানসম্মত একটি ঘটনা। সাধারণ বৃষ্টি যখন বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নিচে নামে, তখন তা বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা ও অন্যান্য কণাকে ধুয়ে ফেলে। কিন্তু যখন বৃষ্টি তীব্র দূষিত বায়ুর মধ্য দিয়ে পড়ে, তখন তা অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করে।

প্রথমত, শোধনাগার ও তেলের ডিপোতে আগুন লাগলে তা থেকে বিপুল পরিমাণ কালো ধোঁয়া ওঠে। এই ধোঁয়ায় থাকে অসম্পূর্ণ দহনের ফলে সৃষ্ট কার্বন কণা, পোড়া তেলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক।

দ্বিতীয়ত, এই ধোঁয়া ও কণাগুলো বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে মিশে যায়। ঘনীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত জলীয় বাষ্প এই কণাগুলোকে কেন্দ্র করে জমাট বাঁধতে শুরু করে। সাধারণ বৃষ্টির ফোঁটা তৈরির সময় যেমন ধূলিকণা কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করে, এখানে সেই ভূমিকা পালন করে পোড়া তেল ও কার্বনের কণা।

তৃতীয়ত, যখন এই কণাগুলোকে কেন্দ্র করে বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি হয়, তখন সেই ফোঁটার ভেতরেই মিশে যায় পোড়া তেল ও কার্বন। ফলে বৃষ্টির পানি কালো বা গাঢ় বাদামি রঙ ধারণ করে। এই পানিতে তীব্র পোড়া গন্ধ থাকে এবং স্পর্শ করলে তৈলাক্ত ভাব অনুভূত হয়।

এই কালো বৃষ্টি শুধু অদ্ভুত দৃশ্যই নয়, এটি একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি। দূষিত বৃষ্টির পানিতে থাকা রাসায়নিক উপাদানগুলো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা: বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

ত্বকের সমস্যা: তৈলাক্ত ও রাসায়নিকমিশ্রিত বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে এলে ত্বকে জ্বালা, চুলকানি ও অ্যালার্জি হতে পারে।

পানি ও মাটি দূষণ: এই বৃষ্টি যখন মাটিতে পড়ে, তখন তা মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে। কৃষিজমি অনুর্বর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব: দূষিত মাটিতে উৎপাদিত ফসলের মাধ্যমে এই বিষাক্ত পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

তবে কালো বৃষ্টি নতুন ঘটনা নয়। ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে বড় বড় যুদ্ধ ও শিল্প দুর্ঘটনার পর।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ: কুয়েত থেকে পশ্চাদপসরণের সময় ইরাকি বাহিনী ৬০০টিরও বেশি তেলকূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। মাসের পর মাস ধরে জ্বলতে থাকা এই কূপ থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার কারণে সৌদি আরব ও ইরানসহ পুরো অঞ্চলে কালো বৃষ্টি হয়েছিল। তখন একে বলা হয়েছিল পরিবেশগত সন্ত্রাস।

২০১০ সালের দীপওয়াটার হরাইজন দুর্ঘটনা: মেক্সিকো উপসাগরে তেলের প্ল্যাটফর্ম বিস্ফোরণের পর ব্যাপক তেল ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে সৃষ্ট ঝড়ের সময় তেলমিশ্রিত বৃষ্টি হয়েছিল।

লন্ডনের গ্রেট স্মগ: শিল্পকারখানা ও কয়লার চুলা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও কুয়াশার মিশ্রণে সৃষ্ট ঘন কালো ধোঁয়াশায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সেটি সরাসরি বৃষ্টি না হলেও, দূষিত বায়ুর ভয়াবহ প্রভাবের ঐতিহাসিক নিদর্শন।

কালো বৃষ্টির ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক যুদ্ধ কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই সীমাবদ্ধ নেই। যখন একটি দেশের শিল্প অবকাঠামো—বিশেষ করে তেল শোধনাগার, রাসায়নিক কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র—হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন তার ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়ে পুরো অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষের জীবনে।

বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন পরিবেশগত যুদ্ধাপরাধ। জেনেভা কনভেনশনের কিছু ধারা অনুযায়ী, পরিবেশের এমন ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি সাধন যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সেই আইন প্রয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কালো বৃষ্টির ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়বে এবং যুদ্ধের এই পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াবে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তেহরানের বাসিন্দাদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। যুদ্ধ চলতে থাকলে আরও বেশি শিল্প স্থাপনায় হামলা হবে এবং কালো বৃষ্টির এলাকা বিস্তৃত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের অভিজ্ঞতা সারা বিশ্বের জন্য এক সতর্কবার্তা। আধুনিক যুদ্ধের পরিণতি কেবল মৃত্যু ও ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়- তা দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনে।

তেহরানের নাগরিকদের জন্য জরুরি পরামর্শ হচ্ছে, কালো বৃষ্টির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, বাইরে বের হলে মাস্ক ও ছাতা ব্যবহার করা, দূষিত পানি ও মাটির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে যুদ্ধ বন্ধের মাধ্যমেই। যতক্ষণ পর্যন্ত তেলের শোধনাগারে আগুন জ্বলবে, ততক্ষণ তেহরানের আকাশ কালো থাকবে এবং কালো বৃষ্টি ঝরতেই থাকবে।

ইরানের ওপর কালো বৃষ্টি আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন—অত্যন্ত ভয়াবহ—মুখ উন্মোচন করেছে। এটি শুধু একটি দেশের ভাগ্য নয়, গোটা অঞ্চলের পরিবেশ ও মানবসভ্যতার জন্য এক সঙ্কটের নাম। যে যুদ্ধে শোধনাগার পুড়িয়ে ফেলা হয়, সেই যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের হিসাব শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে যায়—কারণ পরাজিত হয় পরিবেশ, আর তার শাস্তি ভোগ করে আগামী প্রজন্ম।

সূত্র: সিএনএন, আল-জাজিরা, বিবিসি, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

‘আন্তর্জাতিক’ : আরও খবর

সম্প্রতি