image
শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬ অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় সাংবাদিকরা দাঁড়িয়ে সম্মান জানান -সংবাদ

গণমাধ্যম সম্মিলন: মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন, গণমাধ্যম আক্রান্ত হলে শুধু সাংবাদিকরা নন, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব বিভেদ ভুলে সাংবাদিকদের এখন থেকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। অন্যথায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে বলে।

শনিবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন-২০২৬’-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ যৌথভাবে এই সম্মিলনের আয়োজন করে। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আয়োজনে দেশের সিনিয়র সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

একদল দুর্বৃত্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে অপব্যবহার করে সহিংসতা চালাচ্ছে: নূরুল কবীর

সরকারকে সত্য কথা কেবল গণমাধ্যমই বলে: মাহফুজ আনাম

আগামী সরকার বা নির্বাচিত সরকার এলেই সবকিছু পাওয়া যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই: মতিউর রহমান

সাংবাদিকতা বাংলাদেশে এখনও সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি, সাংবাদিকদের ‘দালাল’ অপবাদ থেকে বাঁচতে হলে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে: শফিক রেহমান

অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টার অঙ্গীকার সত্ত্বেও ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ বাস্তবায়ন করা যায়নি: কামাল আহমেদ

সম্মিলনের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এইজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের একটি ভবনের ওপরে রেখে চারদিকে আগুন লাগিয়ে দমকল বাহিনী আসতে বাধা দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই না।’

তিনি অভিযোগ করেন, একদল দুর্বৃত্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে অপব্যবহার করে এই সহিংসতা চালাচ্ছে। দেড় বছর আগের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরতন্ত্র পরাজিত হলেও, এখন যারা গণমাধ্যমে হামলা করছে, তারা জুলাইয়ের মূল গণতান্ত্রিক চেতনাকেই ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত। তিনি সতর্ক করে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার বাহন হিসেবে কাজ করে, সেগুলোকে দমন করতে আইন, বলপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ এ প্রসঙ্গে বলেন, জুলাই চেতনার নামে গরু কোরবানি দেয়া, মধ্যরাতে অফিসে আক্রমণ করা বা আগুন দেয়া নজিরবিহীন ঘটনা। তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আমরা যতটা অর্জন করেছি, ততটাই আমাদের জন্য কলঙ্ক। ঘৃণায় বিশ্ববাসীর কাছে মুখ দেখানোর অবস্থা আমাদের নেই।’

সরকারের উদ্দেশে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম তার বক্তব্যে বলেন, ‘সরকার, আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোক, আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থা ভয়ে আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই আপনাকে সত্য কথা বলতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার যদি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করে এবং উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে, তবে তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি হচ্ছে কিনা বা জনগণ তা গ্রহণ করছে কিনা, তা কেবল গণমাধ্যমই তুলে ধরতে পারে। সাংবাদিকদের ‘সামাজিক ডাক্তার’ অভিহিত করে তিনি বলেন, চিকিৎসকের কাছে মানুষ যেমন অসুখের কথা জানতে যায়, তেমনি সাংবাদিকরা সমাজের সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরেন।’

সম্মিলনে বক্তাদের মূল সুর ছিল সাংবাদিকদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলা। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো সময়, যে কোনো বিরোধই ক্ষতিকারক। সাংবাদিকরাই সাংবাদিকতা বাঁচাতে পারেন।’ তিনি বলেন, বিগত ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সব সরকারের আমলেই গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে। তাই আগামী সরকার বা নির্বাচিত সরকার এলেই সবকিছু পাওয়া যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, ঐক্য, সমঝোতা এবং সংহতি এই সময়ে আগামী দিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘বিভেদ ভুলে না গেলে একেকজনকে একেকভাবে তুলে নিয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, সাংবাদিকদের কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই। নিউজ যার পক্ষে যায় সে ভালো বলে, আর যার বিপক্ষে যায় সে ‘ধান্দাবাজ’ বলে। তাই ৫৪ বছরের ইতিহাসে এখনই এক সামিয়ানার নিচে সমবেত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও নাহিদ ইসলামের অঙ্গীকার সত্ত্বেও আইনটি হয়নি। কমিশন আইনের খসড়া ও সুপারিশ জমা দেয়ার পরেও গণমাধ্যমকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, যার দায় সরকারকেই নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা অঙ্গীকার করেও সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি।’

এ প্রসঙ্গে পিআইবি’র মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, গণমাধ্যম কমিশনের ২৭টি সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে গেলেও ১২টি ফিরে এসেছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অদৃশ্য কোনো ‘জ্বিনের আছরে’ আটকে আছে, যা তার নিজেরও অজানা। তিনি আরও বলেন, পেশাটিতে অভ্যন্তরীণসহ নানাভাবে ঘুণে ধরেছে। বাইরের আক্রমণের সামনে এসে বোঝা যাচ্ছে দুদিকেই পুনর্গঠন দরকার।

সাংবাদিকদের মেরুদ- শক্ত রাখতে এবং ‘দালাল’ অপবাদ থেকে বাঁচতে বিকল্প আয়ের পথের ওপর গুরুত্বারোপ করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের আমি বলবো আপনারা একটা বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখুন। শুধুমাত্র সাংবাদিকতার ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে দালাল উপাধি পেতে পারেন।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার বাইরে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে দক্ষতা ছিল বলেই তিনি এরশাদ ও হাসিনা সরকারের আমলে বিতাড়িত হয়েও টিকে ছিলেন এবং বিদেশে কাজ করতে পেরেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সাংবাদিকতা এখনও বাংলাদেশে সম্মানজনক পেশা হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের ভোল পাল্টানো বা ‘ম্যাজিক’ দেখানো সম্মান বাড়ায় না বরং কমায়।

সম্মিলনে বক্তারা গণমাধ্যমের ভেতরের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানান। ডেইলি আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে সেই শূন্যস্থান ভুয়া সংবাদ বা ‘ফেইক নিউজ’ দখল করে নেয়, যা সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ আশা প্রকাশ করেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করবে।

রংপুরের দৈনিক যুগের আলোর সম্পাদক মমতাজ শিরীন বলেন, গণমাধ্যমকে রক্ষা করতে হলে একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহ সভাপতি মুনিমা সুলতানা বলেন, সংবাদকক্ষগুলোতে পেশাদারত্ব, সহানুভূতি ও সমমর্মিতার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদারত্বের জায়গা তৈরি করতে হবে এবং নারীসহ সব জাতি বর্ণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

গাজীপুরের শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি এস এম মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, ‘অধিকার কেউ বিলিয়ে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। দুর্বৃত্ত সাংবাদিক তাড়াতে এবং ঐক্য ঠিক রাখতে আমাদের নিজেদেরই আইন করা প্রয়োজন।’ লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, অন্তরের সংকীর্ণতা ও দলীয় লেজুড়বৃত্তি দূর না করলে ঐক্য সফল হবে না।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। আয়োজকরা জানান, সম্প্রতি গণমাধ্যমের ওপর যে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা চলছে, তা রুখতে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সম্মিলনের আয়োজন।

সম্মিলনে নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের সদস্যদের পাশাপাশি অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো), ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, সম্পাদক ও প্রকাশকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা অঙ্গীকার করেন, সব বিভেদ ভুলে সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পতাকাতলে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।

‘মিডিয়া’ : আরও খবর

» রাজধানীতে গণমাধ্যম সম্মিলন শনিবার

সম্প্রতি