প্রখ্যাত বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকার (৬৭) মারা গেছেন। শুক্রবার ভোর ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এই বাউলশিল্পী।
ময়মনসিংহ জেলা বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম (আসলাম) বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার (গতকাল) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাউলসাধক সুনীল কর্মকার পরলোকগমন করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসে আক্রান্তসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। মরদেহ নগরের আঠারো বাড়িতে রাখা হয়েছে। দুপুরে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য টাউন হল মাঠে রাখা হবে। পরে জেলার গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া এলাকায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হবে।’
সুনীল কর্মকারের জন্ম ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি পূর্ব ময়মনসিংহে, বর্তমানে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বারনাল গ্রামে। তার বাবা ছিলেন দীনেশ কর্মকার এবং মা কমলা কর্মকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে সুনীল ছিলেন জ্যেষ্ঠ। দ্বিতীয় ভাই দীলিপ কর্মকার পেশায় একজন স্বর্ণশিল্পী। সর্বকনিষ্ঠ ভাই শ্রীমল কর্মকার এবং বাবা দীনেশ কর্মকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় শিবিরে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
ময়মনসিংহের সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, সুনীল কর্মকার ছিলেন বাউল মালজোড়া গান, মহাজনী গান ও লোকসংগীতের একজন স্বনামধন্য শিল্পী। দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি সাধনা, কণ্ঠ আর সুরের শক্তিতে লোকসংগীত অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মাত্র সাত বছর বয়সেই গান যেন তার (সুনীল কর্মকার) রক্তের প্রতিটি বিন্দু দখল করে নিয়েছিল। সে সময় পাশের গ্রামে বিখ্যাত গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁর বাড়িতে নিয়মিত বসতে বিশাল গানের আসর। সেই আসরের টানে ছোট্ট সুনীল ছুটে যেত সেখানে। গ্রাম থেকে গ্রামে যেখানেই গান, সেখানেই ছিল তার উপস্থিতি। হঠাৎ টাইফয়েড আক্রান্ত হয়ে তার চোখের আলো নিভে যায়। দৃষ্টিশক্তি হারালেও সংগীতের প্রতি তার টান এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি। ছেলের এ অদম্য আগ্রহ দেখে বাবা দীনেশ কর্মকার তাকে নিয়ে যান পাশের গ্রামের বাউল গায়ক ইসরাইল মিয়ার কাছে। শৈশবকালেই সিংহের গাঁয়ের ইসরাইল মিয়ার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সুনীল। গুরু ইসরাইল মিয়ার তাকে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করেন এবং হাতে ধরে সংগীতের পাঠ দেন। সেখানে সংগীত শিক্ষার পাশাপাশি দোতারা বাদনেও তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন।
সুনীল কর্মকারের স্ত্রী আশা রানী কর্মকার বলেন, ‘চার দিন আগে তার স্বামী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’ তিনি বলেন, ‘উনি যে এভাবে চলে যাবেন, সেটা ভাবতে পারি নাই। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাকে গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকায় সাহিত করা হবে।’
ইমতিয়াজ বলেন, ‘সুনীল কর্মকার ৯-১০ বছর বয়সে বাদল প-িতের কাছে হারমোনিয়াম বাজানো শেখেন। তবলার তালিম নেন প্রতিবেশী কাকা গোবিন্দ কর্মকারের কাছে। পরে লখনৌ ঘরানার সৌখিন বেহালাবাদক মীর হোসেনের কাছে বেহালা বাদনের তালিম গ্রহণ করেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেশি-বিদেশি একাধিক বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার স্পর্শে যেমন একতারা, দোতারা, স্বরাজ ও হারমোনিয়াম প্রাণ ফিরে পেত; তেমনি খমক, খঞ্জনি, ঢোল, ঢোলক ও ঢাকও সমান তালে জেগে উঠতো।’
লোকসংগীতে অবদানের জন্য সুনীল কর্মকার ২০২২ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেন ময়মনসিংহের সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান। সুনীল কর্মকারকে শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার দুপুরে তার মরদেহ ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার পাশে হযরত কালু শাহ ফকিরের মাজারের সামনে রাখা হয় বলে জানিয়েছেন নেত্রকোণার বাউল শিল্পী রাসেল সরকার।
নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সভাপতি মাহাবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক তানভীর চৌধুরী বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
অর্থ-বাণিজ্য: শেয়ারবাজারে সাপ্তাহিক লেনদেন বেড়েছে ১৫ শতাংশ