স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল।
‘জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন’ মুছাব্বির, বলছেন স্ত্রী
হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে তেজগাঁও থানায় মামলা
হত্যাকাণ্ডের পেছনের যে বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুইজনের বিষয়ে নিশ্চিত
বৃহস্পতিবার,( ০৮ জানুয়ারী ২০২৬) দুপুরে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাযার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইয়াসীন আলী ও সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এ হুঁশিয়ারি দিয়ে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
রবিন বলেন, মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবি জানাচ্ছি। এই দাবিতে শনিবার (আগামীকাল) ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করছি। এর মধ্যে মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে স্বেচ্ছাসেবক দল কঠোর কর্মসূচি দেবে।’
কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে হোটেল সুপারস্টারের পাশে আহসানউল্লাহ টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের গলিতে গতকাল বুধবার রাত ৮টার কিছু পরে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীরা মুছাব্বিরকে গুলি করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা দুইজনকে উদ্ধার করে বিআরবি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে এদিন তেজগাঁও থানায় মামলা করেন তার স্ত্রী সুরাইয়া।
বাদ জোহর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মুছাব্বিরের কফিন নিয়ে আসা হয়। সেখানে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েল, এসএম জাহাঙ্গীর, মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনসহ স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আলীসহ নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
জানাযার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘আমি বলবো, অনতিবিলম্বে এই হত্যাকা-ের পেছনে যারা জড়িত তারা যারাই হোক অনতিবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আমি সরকারকে বলতে চাই আপনারা বলেছেন, আপনারা নির্বাচন করবেন। আমরা আপনাদের কথায় বিশ্বাস করিছি, আপনার নির্বাচনের তারিখ দিয়েছেন আমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছি।
‘কিন্তু যখন আমরা দেখি এখন পর্যন্ত ওসমান শরীফ হাদি হত্যার মূল হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার হন নাই কিন্তু মুছাব্বিরের যে হত্যাকা- হয়েছে যদিও বেশিক্ষণ হয় নাই.এখানে আমাদের সহকর্মীরা বলেছেনÑ ২৪ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন। আমরা আশা করবো এই সময়ের মধ্যেই হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। তা নাহলে ধরে নেব আপনাদের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি আছে অথবা আপনারা পারবেন না। তাই সরকারকে বলবো, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।’
হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘এই পার্টি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আজকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই, জননেতা জনাব তারেক রহমানের সাহেবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করবার যে লড়াই চলছে কোনো হত্যাকা- সে লড়াইয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না, কোনো রক্তপাত সেই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে না।
‘বাংলাদেশের মাটিতে আমরা নির্ধারিত সময়েই জনগণের সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমেই আমরা নির্বাচিত করবো, কোনো ষড়যন্ত্রই সেই পথে বাধা হতে পারবে না। ইনশল্লাহ আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান এখন আমাদের মাঝেই আছে। আমরা লড়াইকে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে যদি আমাদের আরও অনেকবার মুসাফির হতে হয় আমরা মুসাফির হব। কিন্তু আমরা আমাদের লড়াইকে আর যৌক্তিক নিয়ে যাব।’
স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু বলেন, ‘মুছাব্বির একজন দেশপ্রেমিক সাহসী সৈনিক। অনেকবার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে গ্রেপ্তার হয়েছে। একবার তাকে গুম করা হয়েছে। আমার মনে আছেন আমাদের নেতা রুহুল কবির রিজভী রাতে সংবাদ সম্মেলন করে মুছাব্বিরকে গুম করার খবর দেশবাসীকে জানায় গণমাধ্যমের মাধ্যমে। ‘পরে গুম থেকে রক্ষা পেয়ে কারাগারে গেলে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী দলের একজন সাহসী কর্মী ছিলেন তিনি। তার এই হত্যাকা- মেনে নেয়া যায় না।
মহানগর উত্তরের সদস্য আমিনুল হক বলেন, ‘একটি মহল নির্বাচন বানচাল করার জন্য হত্যাকা- সংঘটিত করছে। মুছাব্বির একজন সাহসী সৈনিক ছিলেন। শত শত মামলা, নিপীড়ন সহ্য করেছেন কিন্তু রাজপথ ছাড়েনি। আমরা মনে করি, মুছাব্বিরের হত্যাকা- নির্বাচন বানচালকারীদের চক্রান্তের অংশ। উদ্দেশ্য একটাই দেশকে অস্থিতিশীল করা। আমাদের অবশ্যই এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।’
ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন মুছাব্বিরেরে হত্যাকা-ের নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘সরকার ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে বলবো, আপনারা মুছাব্বিরের হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করুন নইলে আমরা খুঁজে বের করবো। এই হত্যা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।’ আজিজুর রহমান মুছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম-সম্পাদকও ছিলেন এক সময়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে গেছেন।
# ‘জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন’ মুছাব্বির, স্ত্রী
আজিজুর রহমান মুছাব্বির বেশ কিছুদিন ধরে ‘জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন’ বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। বৃহস্পতিবার তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে আমাদের বলেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই তার স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন।’ তবে কারা কেন এই হুমকি দিয়েছে সে ব্যাপারটি সুরাইয়া বেগম পুলিশের কাছে স্পষ্ট করেননি বলে জানান উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, ‘হুমকির বিষয়ে মুছাব্বিরের পক্ষ থেকে পুলিশকে আগে কখনো অবহিত করা হয়নি।’
# হত্যাকা-ের পেছনের যে বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
এদিকে পুলিশ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুইজনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। সেখানে একজনের চেহারা কিছুটা বোঝা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপ-কমিশনার ইবনে মিজান। তিনি বলেন, ‘তাকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যার তদন্তে অনেকটা অগ্রগতি হবে।’ ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে থানা পুলিশ ছাড়াও গোয়েন্দা পুলিশ,র্যাব সমন্বয় করে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
মুছাব্বির হত্যার ঘটনার পেছনে কারওয়ান বাজারে ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ। গত বছর ২৯ ডিসেম্বর চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। হত্যা মামলার তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার অভিযোগে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের এলাকায় আধিপত্যটা কমে গেলে মুছাব্বির সেই জায়গা ‘নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে’ বলে অভিযোগ উঠে। এ নিয়ে এলাকায় বেশ উত্তেজনা চলছিল।
এছাড়াও ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখল নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা চলে আসছে। এই গ্যারেজ দখল ঘটনায় মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে পুলিশ। এসব কারণেই মুছাব্বিরের স্ত্রীর স্বামীর জীবননাশের হুমকির অভিযোগের মিল আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন। তবে এর পাশাপাশি হত্যার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখার কথা বলছেন তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।
# মামলার এজাহারে যা আছে
মামলার এজাহারে বলা হয়, গতকাল বুধবার রাতে কারওয়ান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন মুছাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরী বাজারে আহসানউল্লাহ ইন্সটিটিউটের সামনে পাঁকা রাস্তায় পৌঁছালে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে।
তাতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই, পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে সুফিয়ান বেপারী মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করে হামলাকারীরা। মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়। এদিকে বিআরবি হাসপাতালে চিকিৎসকরা মুছাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করার পর তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পাঠানো হয়। মাসুদকেও বিআরবি হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে পেটে অস্ত্রোপচার করা হয়। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
সারাদেশ: মহেশপুর সীমান্তে যুবকের মরদেহ উদ্ধার