ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা, উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নির্বাচনবিষয়ক এক সংলাপে অংশ নেয়া আলোচকরা। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং পলাতক আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় এই আশঙ্কা। প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে আলোচকদের মধ্য থেকে। নির্বাচনের আর ২৯ দিন বাকি। এখনও ‘নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বা ভোটের আমেজ তৈরি হয়নি’ বলেও আলোচনায় উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার, (১৩ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বিভাগীয় সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘এখন কোনো মবের ঘটনা ঘটলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে থেকে ‘তামাশা’ দেখে। গণঅভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৭১৩ জন এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। ফলে আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’
রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘জুলাই সনদে নারীদের আসন নিয়ে আলোচনা হলো। ৫ শতাংশ মনোনয়ন কেন নারীরা পেল না, এই প্রশ্ন কেউ করেনি। তাহলে কোথায়, কোন সংস্কার করলাম?’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিদের সদস্য, রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি ধ্বংস করেছেন রাজনীতিবিদরা। তারা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ছাত্রদের অপব্যবহার করছেন।’
আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির আগে কাঠামোগত কারণে যারা পিছিয়ে আছেন তাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। এজন্য আদিবাসীদের উন্নয়নে একটি কমিশন গঠনের পক্ষে মত দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের ওপর জোর দেয়ার পাশাপাশি বলেন, ‘কিন্তু শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এজন্য কতগুলো সংস্কার দরকার, যাতে নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশে নেতা তৈরি হয়।’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকার ওপরও জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে দেশে কর্মক্ষম ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। বন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও দলগুলোর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা দরকার বলে মনে করি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অপতথ্য মোকাবিলার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘অপতথ্য নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমনটা হয়েছিল যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিটের সময়। কিন্তু অপতথ্য চিহ্নিত করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ দেখছি না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা।’
সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো মব সন্ত্রাস। সরকারের নীরবতা ও দুর্বলতার কারণে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্য সমস্যাগুলো হলো কালোটাকার ব্যবহার, প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই না করা। এ জন্য নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি থাকা দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য ও ভুল তথ্য রোধে ফ্যাক্টচেকিং সেল তৈরি করা দরকার।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, ‘নির্বাচনের ২৯ দিন বাকি আছে মাত্র। আমি নিজে একজন প্রার্থী। নির্বাচনী আমেজ যেটা বলা যায়, সেটা কিন্তু এখনো তৈরি হয়নি। আমরা জনসংযোগ ইত্যাদি করছি। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে জনগণ আশ্বস্ত বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। কারণ, জনগণ এখনও প্রশ্ন করে যে নির্বাচন আসলেই হবে কিনা।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘যৌথ অভিযান অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, এগুলো আগে আমিও বলতাম। কিন্তু এখন আমার ভয় লাগে কেন জানেন? কারণ, ভয় লাগে যে পাওয়ারপুল লোকজন একটি লিস্ট ধরিয়ে দেয় প্রশাসনের কাছে। সে লিস্টে থাকে অনেক মানুষ, যারা হয়তো আগে বিভিন্ন দল করত, এখন চুপচাপ আছে। প্রশাসন সেই নিরীহ মানুষদের গ্রেপ্তার করে, আর যারা দোর্দ- প্রতাপশালী, সন্ত্রাসী, তারা কিন্তু বিভিন্ন দলের শেল্টারে ইতিমধ্যে চলে এসেছে...এবং এইটা কিন্তু আরও একটা ইমব্যালেন্স এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘অনেক সুদূরপ্রসারী সংস্কার নিয়েই গণভোট হবে। সেগুলোর ব্যাপারে আপনারা জেনেবুঝে হ্যাঁ এবং না এর পক্ষে অবস্থান নেবেন। হ্যাঁ জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার হওয়া। না জয়যুক্ত হওয়া মানেই সংস্কার না হওয়া। সংস্কার না হলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারি। সংস্কার না হলে যে সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসবে, তাদেরও স্বৈরাচারী হওয়ার আশঙ্কা একবারে উড়িয়ে দেয়া যাবে না।’