ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা ঘোষণা শেষ মুহূর্তে এসে হোঁচট খেয়েছে। বুধবার, (১৪ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ধুমধাম করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কথা থাকলেও, শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে তা স্থগিত করা হয়।
আসন ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে স্থগিত ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন
নেপথ্যে ‘দর কষাকষি’
ও জরিপ রাজনীতি
গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে সবাইকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে: জামায়াত আমির
পারস্পরিক আলোচনা চলমান, দ্রুতই একবাক্স নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে: ইসলামী আন্দোলন
মূলত চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জামায়াতের আসন সংখ্যা নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা না হওয়াতেই এই বিপত্তি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সদ্য প্রকাশিত একটি নির্বাচনী জরিপ, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
বুধবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানান, ‘কিছু প্রস্তুতি বাকি থাকায় এবং অনিবার্য কারণবশত এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনের নতুন তারিখ জানানো হবে।’
জোট সূত্রে জানা গেছে, মূল বিরোধ ‘উইনেবল’ অর্থাৎ বিজয়ী হওয়া যাবে এমন আসনের সংখ্যা নিয়ে। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ৪৫টি আসন ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছিল জামায়াত ইসলামী এবং আরও ৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন কমপক্ষে ৬৫টি আসনের দাবিতে অনড়। দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
একইভাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৬টি আসন দেয়ার প্রস্তাব করেছিল জামায়াত। কিন্তু মামুনুল হকের দল ন্যূনতম ২৫টি আসন দাবি করে। এই দুই প্রধান শরিকের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলনটি স্থগিত করতে বাধ্য হয় জামায়াত।
চলমান সার্বিক পরিস্থিতে ‘ধৈর্যহারা না হওয়া বা অপ্রীতিকর কোনো কিছুতে না জড়ানোর’ জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন জামায়াত আমির শফিকুর রহমান। তিনি বুধবার ফেইসবুকে দেয়া এক বার্তায় বলেন, ‘সময়টি জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সবাইকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে এবং কারও সঙ্গে বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’
এই বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার জন্য বুধবার বিকেলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জরুরি বৈঠক করে। বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পরে দেশ, জাতি ও ইসলামের স্বার্থে পীর সাহেব চরমোনাই ইসলামপন্থিদের একবাক্স নীতির ঘোষণা করেন। সেই নীতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখনো অটল থেকে কাজ করে যাচ্ছে।’
বিবৃতিতে গাজী আতাউর রহমান আরও বলেন, ‘আমাদের পারস্পরিক আলোচনা চলমান। ইনশাআল্লাহ দ্রুতই একবাক্স নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে।’
জোটের এই টানাপোড়নের ঠিক আগে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি’ (আইআইএলডি) ও আরও কয়েকটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে একটি নির্বাচনী জরিপ প্রকাশ করা হয়। গত সোমবার প্রকাশিত এই জরিপে দেখানো হয়, নির্বাচনে বিএনপির জনসমর্থন ৩৪.৭ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ৩৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ জনপ্রিয়তার দিক থেকে বিএনপির খুব কাছাকাছি জামায়াত।
কিন্তু জরিপটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো শরিক দলগুলোর অবস্থান। জরিপে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জনসমর্থন দেখানো হয়েছে মাত্র ৩.১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের রাজনৈতিক ছায়ার বাইরে শরিকদের যে বড় কোনো বাস্তবতা নেই, তা এই জরিপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, জামায়াত ঘনিষ্ঠরা এই জরিপটি করিয়েছেন মূলত শরিকদের ‘সঠিক জায়গা’ মনে করিয়ে দেয়ার জন্য। জরিপে শরিকদের জনসমর্থন নগণ্য দেখিয়ে আসন ভাগাভাগির টেবিলে জামায়াত নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চেয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। জরিপ প্রকাশকারী আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামায়াত ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়াও ১১ দলীয় জোটে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), এবি পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।