জামায়াত জোট থেকে বেরিয়ে গেল ইসলামী আন্দোলন, একক ভাবে নির্বাচনের ঘোষণা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

নানা জল্পনা-কল্পনা, দফায় দফায় বৈঠক এবং আসন সমঝোতার নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে না তাকার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

বাকি ৩২ আসনে নীতি ও আদর্শের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন প্রার্থীদের সমর্থন দেয়া হবে

জোটে না থাকার নেপথ্যে জামায়াতের সঙ্গে ‘আদর্শিক বিচ্যুতিকে’ সামনে এনেছে ইসলামী আন্দোলন

অন্য ইসলামী দলগুলোকে জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান

জোট না থাকার পেছনে আসন ভাগাভাগির চেয়ে জামায়াতের সঙ্গে ‘আদর্শিক বিচ্যুতির’ কথা বলছেন দলটির নেতারা। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটি জানিয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দলের ২৬৮ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়বেন এবং তাদের কেউই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না।

শুক্রবার, (১৬ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয় জোট নির্বাচনী ঐক্যের ঘোষণা দিলেও সেখানে ইসলামী আন্দোলনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিতি ছিলেন না।

ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর রহমান জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন মোট ২৭০টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিল। এরমধ্যে যাচাই-বাছাইয়ে দুজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। ফলে বর্তমানে ২৬৮টি আসনে তাদের প্রার্থীরা বৈধভাবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।

দলের মুখপাত্র স্পষ্ট করে বলেন, ‘২৬৮টি আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা আলাদাভাবে নির্বাচন করবেন। একজনও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন না।’ তিনি আরও জানান, ৩০০ আসনের মধ্যে বাকি ৩২টি আসনে ইসলামী আন্দোলনের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন প্রার্থীদের সমর্থন দেয়া হবে।

জোট না থাকার কারণ হিসেবে নিছক আসন ভাগাভাগির চেয়ে আদর্শিক মতপার্থক্যকে বড় করে সামনে এনেছে ইসলামী আন্দোলন। সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের মূল আদর্শ থেকে সরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইনানুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তিনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করেছেন যে শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না।’

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মাহাসচিব প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘দেশের সব মানুষ একমত যে, দেশের বর্তমান দুর্দশার কারণ বিদ্যমান আইন। সেই বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করার জন্যই আমাদের রাজনীতি। এখন যদি সমঝোতার প্রধান দলই বিদ্যমান আইনে দেশ পরিচালনার প্রতিজ্ঞা করে, তাহলে আমরা শঙ্কিত হই।’

এছড়াও জামায়াতের আমিরের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জামায়াত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের কথা বলছে, যার অর্থ দাঁড়ায় তারা একটি সমঝোতার নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় পর মানুষের মনে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হওয়া নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে অন্য ইসলামী দলগুলোকেও জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলো ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ঘোষণা করে। সেখানে ২৫৩টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয় এবং ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল। মঞ্চে দলটির আমিরের জন্য চেয়ারও রাখা হয়েছিল কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হননি। জামায়াত নেতারা আশা প্রকাশ করেছিলেন শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন তাদের সঙ্গে যুক্ত হবে। জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছিলেন, কিছু আসনে সমস্যা রয়েছে যা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ঠিক হবে। কিন্তু শুক্রবার বিকেলের সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন সেই আশার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন ছিল শুরু থেকেই। সূত্রমতে, ইসলামী আন্দোলন ৭০টি আসনের কমে জোটে আসতে রাজি ছিল না, কিন্তু জামায়াত তাদের সর্বোচ্চ ৪৫টি আসন ছাড়তে চেয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াত শেষ মুহূর্তে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলকে বেশি আসন দিয়ে নিজেদের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়।

ঘোষিত জোটের আসন বণ্টন অনুযায়ী, জামায়াত ১৭৯, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৭, এবি পার্টি ৩, বিডিপি ২ এবং নেজামে ইসলাম পার্টি ২ টি আসনে লড়বে। তবে ইসলামী আন্দোলন সরে দাঁড়ানোয় এখন ফাঁকা রাখা ৪৭ আসনেও জামায়াত বা জোটের অন্য শরিকরা প্রার্থী দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একক নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র স্বীকার করেছেন তাদের সামনের পথচলা মসৃণ নাও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতার রাজনীতি সেভাবে করি না। আমাদের মূল লক্ষ্য ইসলাম। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আমরা বৈরিতার শিকার হয়েছি।’

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার যে প্রচেষ্টা গত মে মাস থেকে শুরু হয়েছিল, ইসলামী আন্দোলনের এই সিদ্ধান্তের ফলে তা বড় ধরনের ধাক্কা খেল। এখন ২৬৮ আসনে হাতপাখার একক লড়াই এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের পৃথক অবস্থান নির্বাচনের মাঠে ইসলামপন্থি ভোটের বিভাজনকে স্পষ্ট করে তুললো।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি