নারী ক্ষমতায়িত হলে জাতির ভবিষ্যৎ বদলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। তিনি বলেছেন, ‘যখন নারীদের দূরে না ঠেলে স্বাগত জানানো হয়, তখন তারা কেবল নিজেদের জীবনই বদলায় না, তারা তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং জাতির ভবিষ্যৎও বদলে দেয়।
‘বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন চায়, তাহলে ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ কেবল শিক্ষা, অফিস বা নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, আমাদের ঘর, প্রতিষ্ঠান এবং মানসিকতাতেও পৌঁছাতে হবে। আর এর দায়িত্ব আমাদের সবার।’ রোববার, (১৮ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ‘জাতি গঠনে নারী, নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শীর্ষক’ পলিসি ডায়ালগে বক্তব্য রাখছিলেন ব্যারিস্টার জাইমা।
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে দাঁড়িয়েছি ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে। বাংলাদেশের এই পলিসি লেভেলে আমার প্রথম বক্তব্য এটা। আমি এমন কেউ নই, যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে বা সব সমস্যার সমাধান জানা আছে। ‘তবুও আমি বিশ্বাস করি, নিজের ছোট্ট জায়গা থেকেও সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার মধ্যে থাকা উচিত। আমি এসেছি শুধু শুনতে, শিখতে এবং একসঙ্গে কাজ করার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে।’
দেড় দেশক পর গত ২৫ ডিসেম্বর পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরেন জাইমা রহমান। জনপরিসরে দেয়া তার প্রথম বক্তৃতায় উঠে এসেছে নারীর অগ্রযাত্রায় তার দাদা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও দাদী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবদানের কথা।
জাইমা রহমান বলেন, ‘নারীর মর্যাদা ব্যক্তিগত ও জনপরিসর উভয়ক্ষেত্রেই স্বীকৃত হওয়া উচিত, এ বিশ্বাস আমাদের পরিবারের বাইরেও আমার দাদা-দাদীর জীবন ও নেতৃত্বে প্রতিফলিত হয়েছিল। আমার দাদা, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জানতেন যে নারীদের বাদ দিয়ে উন্নয়ন কখনোই পূর্ণ হতে পারে না।
‘তিনি নারীদের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে ও জনপরিসরে সক্ষম অবদানকারী হিসেবে দেখতেন। এ বিশ্বাসই একজন নেতা হিসেবে নেয়া তার সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করেছিল। তার নেতৃত্বে পোশাক খাতের সম্প্রসারণের ফলে লাখ লাখ নারী প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে প্রবেশের সুযোগ পান, অর্জন করেন স্বাধীনতা ও আয়ের ক্ষমতা।’
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নাতনি বলেন, ‘নারী ও কন্যাশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য ও কাঠামো প্রয়োজন এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকে একই সময়ে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ‘এগুলো কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তই ছিল না, বরং তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধেরই বহিঃপ্রকাশ।’
রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর বিএনপির হাল ধরেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া, তখন তিনি নিতান্তই একজন গৃহবধূ। তিনি ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, আমৃত্যু তিনি সে দায়িত্বে ছিলেন। তার বড় ছেলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর গত ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
জিয়াউর রহমানের মূল্যবোধকে খালেদা জিয়া এগিয়ে নিয়ে যান মন্তব্য করে তাদের দৌহিত্রী জাইমা বলেন, ‘আমার দাদি বেগম খালেদা জিয়া, যিনি শিক্ষার মাধ্যম নারীর ক্ষমতায়ন এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের গুরুত্ব বুঝেছিলেন। তার নেতৃত্বে কন্যাশিক্ষাকে সুযোগ নয়, অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
‘বিনামূল্যের মাধ্যমিক শিক্ষা, পাশাপাশি ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ ও ‘নগদ অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচি এসব উদ্যোগ দেশের লাখো মেয়েকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনধারা বদলে দেয়। ‘তার প্রণীত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছাত্রী সহায়তা প্রকল্প মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রথমবারের মতো লিঙ্গসমতা আনে এবং বাংলাদেশ ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও অনুকরণযোগ্য মডেল হয়ে ওঠে।’
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গত বছরের শুরুতে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেয়া হয়েছিল। তখনকার এক ঘটনা তুলে ধরে জাইমা রহমান বলেন, ‘দাদি যখন আমাদের সঙ্গে লন্ডনে ছিলেন গত বছরের প্রথমের দিকে, উনি যখন এসেছিলেন- তখন হাসপাতালে ছিলেন চিকিৎসার জন্য। ওখানে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরনের নার্স ছিল, ডাক্তার ছিলেন এবং এক নার্স ছিলেন নাইজেরিয়ার, নাইজেরিয়া ওয়েস্ট আফ্রিকাতে।
‘আম্মা-আব্বা একদিন দাদুকে সকাল সকাল দেখতে গেছিল, তো নার্স বলেছে যে, ‘ওহ আমি তো আপনার মাকে চিনেছি’। আম্মু-আব্বু বলল কীভাবে? ‘আপনার মা-ই প্রথম ইলেক্টেড প্রাইম মিনিস্টার বাংলাদেশের না?’ আম্মু-আব্বু তো অবাক; ‘হ্যাঁ আপনি কীভাবে জানেন?’ তো নার্স তারপর বলল যে, ‘আপনাদের উনি যে এত কিছু করেছেন মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্পেশালি প্রাইমারি এডুকেশন, ফুড ফর এডুকেশন, ক্যাশ ফর এডুকেশন, এগুলো আমাদের সরকার ওই ৩৫-৩০ বছর আগে দেখে ইমপ্লিমেন্ট করেছিল’।
‘আর ওই কারণে লাখ লাখ মেয়েরা ওদের দেশের গ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় এখনও শিক্ষা পাচ্ছে অন্তত প্রাইমারি এডুকেশন লেভেলে।’ অনুষ্ঠানের প্রশ্নোত্তর পর্বে নারী নিরাপত্তার বিষয়ে জাইমা রহমান বলেন, ‘এমনিতে তো নিরাপত্তা অনলাইনে তো সেইফটি, সিকিউরিটি হয়তোবা নাই। যেটা হয়তোবা সামনা-সামনি মানুষের বিকজ অব মানুষের আচরণ-বিচরণ, কালচার উনারা হয়তোবা কিছুটা হবে। প্রথম যদি আমরা শুরু করি আন্ডার ২৫ উইম্যান দে ফেইস মোস্টলি অনলাইন অ্যান্ড অফলাইন।
‘ইন টার্মস অব প্রোটেকশন ডিজিটাল লিটারেসি স্কিলস ইনটার্মস অব সফট ডিফেন্সেস এজ ওয়েল শেখানো উচিত। বিকজ অব দেয়ার ইজ আ অ্যাসপেক্ট অব কনফিডেন্স, যদি আমরা কনফিডেন্ট ফিল করি, আমরা বুঝি যে ওকে হাউ আর অলসো সেইফ অনলাইন অ্যান্ড অফ লাইনে। তাহলে ওটা তো মাইন্ডসেটের একটা বিষয় এসে পড়ে, এটা এক নাম্বার। দুই নাম্বার বিষয় হচ্ছে যে, ইন টার্মস অব লিগ্যাল প্রোটেকশন আমরা আবার বলবো, বিভিন্ন ধরনের আইন করা হয় কিন্তু এগুলো বাস্তবায়ন হয় না এটা আমরা কোর্ট সিস্টেমেও দেখতে পারছি।’
তিনি বলেন, ‘কোর্ট সিস্টেমে অনেক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিষয়ের কারণে হচ্ছে না, বহু বছর রয়ে যাচ্ছে, কোনো কিছু হচ্ছে না। ‘আমাদের চিন্তা করতে হবে- প্রথমে কীভাবে থামানো যাবে। আমরা বললাম যে, হয়তোবা কমিউনিটি ট্যাক্স যদি করা হয় রিপোর্টিং সিস্টেম যদি করা হয় বেটার স্ট্রিট লাইটিং ঢাকা শহর ছাড়াও অনেক রাস্তায় ঠিক মতো লাইটিং থাকে না রাত্রে।’
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নারীর ক্ষমতায়নে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যার এখন ৫১% নারী এবং ৪৯% পুরষ। সেদিক থেকে আমি এখানে মাইনারিটি। ‘আমাদের নারীদের সামনে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের নেতা তারেক রহমান সাহেব ফ্যামিলি কার্ড চালু করার কথা বলেছেন।’ উপস্থাপক কাজী জেসিনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) চেয়ারম্যান, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী হক চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, ব্র্যাক ইন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদসহ বিভিন্ন পেশার নারীরা।