সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখান
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেয়ার অভিযোগ এনে সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) নগরীর ষোলশহরে বিপ্লব উদ্যানে এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা এ দাবি তুলে ধরেন। এছাড়া ৩৩০ জন ‘দুষ্কৃতকারীর’ বিষয়ে সিএমপির জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখান করে এনসিপি নেতারা অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার দাবি করেছেন। সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী মোহাম্মদ এরফানুল হক।
লিখিত বক্তব্যে চসিক মেয়রের পদত্যাগ দাবি করে বলা হয়েছে, চসিকের মেয়র পদটি প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদ। এই পদে থেকে ডা. শাহাদাত হোসেন বিএনপি প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। চসিক এলাকায় চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপির প্রার্থী আছেন। এ অবস্থায় বিএনপি দলীয় একজন ব্যক্তি যদি মেয়র পদে বহাল থাকেন তাহলে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না। এটি নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। চট্টগ্রামের নির্বাচনি পরিবেশ অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ রাখতে হলে অবিলম্বে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- নগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী জোবাইর হোছাইন, নিজাম উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন সম্প্রতি দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন- আপনারা জানেন, বর্তমান যে সরকার, এটা কোনো রাজনৈতিক সরকার না, এটা একটা অরাজনৈতিক অর্ন্তবর্তী সরকার। এই সরকারে আমাদের দু’জন ছাত্র উপদেষ্টা ছিলেন- মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আপনারা দেখেছেন, নির্বাচনের কারণে উনারা দু’জন পদত্যাগ করেছেন, উনাদের কেউই নির্বাচন করছেন না, একজন পার্টি করছেন, আরেকজন তো পার্টিও করছেন না, নির্বাচনও করছেন না। তারপরও উনারা উনাদের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার জন্য। আমরা একইভাবে ডা. শাহাদাত ভাইকেও অনুরোধ করব, একইভাবে দাবিও করব যে উনি যেন পদত্যাগ করেন।
আগামী ২৭ জানুয়ারির মধ্যে পদত্যাগের সময় বেঁধে দিয়ে তিনি বলেন, মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ভাই, উনি দীর্ঘসময় ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আমরা উনাকে সম্মান করি। উনি ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ে মেয়র হয়েছেন, আমরা চাই উনি জনগণের রায়ে মেয়র হোক। ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি যদি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়, তাহলে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি এর মেয়াদ শেষ হবে। আর মাত্র সপ্তাহখানেক আছে। আমরা দাবি করছি, ২৭ জানুয়ারির মধ্যে অবশ্যই শাহাদাত ভাইকে পদত্যাগ করতে হবে।
এখানে তারেক রহমানের নির্বাচনি সমাবেশ হবে, উনি যেভাবে সমাবেশের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন, মেয়র পদে থেকে উনি আবু সুফিয়ানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন, মেয়র পদে থেকে এটা উনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী উনাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। সুতরাং, উনি যদি ২৭ জানুয়ারির মধ্যে পদত্যাগ না করেন, আমরা তীব্র আন্দোলনে যাব, আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা এটা জানিয়ে রাখলাম।
এদিকে গত ১৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ৩৩০ জন ‘দুষ্কৃতকারীর’ নাম উল্লেখ করে তাদের এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই ‘জুলাই আন্দোলনের’ সময় সংঘটিত হত্যাকা-সহ একাধিক মামলার আসামি সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ (এমপি) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী। এছাড়া আইনজীবী হত্যা মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া কারাবন্দি ইসকনের সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী এবং কয়েকজন পেশাদার অপরাধীর নামও তালিকায় আছে।
সিএমপির জারি করা এ গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা মামলার অনেক আসামি এবং চট্টগ্রামের কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি স্পষ্টভাবে এই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করছে। এনসিপি মনে করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
প্রশ্নের জবাবে এনসিপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সিএমপি একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ৩৩২ জন সন্ত্রাসীর বিষয়ে। আমাদের প্রশ্ন, সিএমপি কমিশনার যদি জানেন যে, এখানে ৩৩২ জন সন্ত্রাসী আছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, তাহলে তো পুলিশের উচিত তাদের গ্রেফতার করা। বিদেশে থাকলে প্রয়োজনে সেখান থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা উচিত। যদি সেটা না পারে, তাহলে তাদের ছবি টানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা। এ কাজই তো পুলিশের করার কথা। কিন্তু উনি কীভাবে সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করে বলেন যে, আপনাদের শহরের মধ্যে নিষিদ্ধ করা হলো। একজন ব্যক্তি যদি অপরাধী হয় তাহলে সে জেলে থাকবে আর যদি অপরাধী না হয় তাহলে সে ঘুরবে, সে থাকবে, বসবাস করবে। কিন্তু আপনি কিভাবে শহরের মধ্যে তাদের নিষিদ্ধ করতে পারেন আমরা কোনোভাবেই এটা মানি না, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।
গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিএমপি সন্ত্রাসীদের সতর্ক করে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা দেখেন, এখানে সাইফুল ইসলাম লিমনের নাম আছে, হেলাল আকবর বাবরের নাম আছে, জুলাই আন্দোলনের সময় অস্ত্র হাতে তাদের ছবি আপনারা সাংবাদিকরাই তুলে পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার না করে উলটো সতর্ক করে দেয়া যে, আপনারা চট্টগ্রাম শহরে আসবেন না, আসলে আপনাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ধরনের একটি অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর এবং সন্ত্রাসীদের আরও সতর্ক করে একটা বিজ্ঞপ্তি যে দেওয়া হলো, আমরা এটার তীব্র নিন্দা জানাই। এই বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য ভিত্তিহীন।
একজন সন্ত্রাসী চট্টগ্রামে থাকতে পারবে না, তার মানে কি তারা নোয়াখালী থাকতে পারবে, ফেনী থাকতে পারবে এই দায়সারা বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলো কেন যেসব সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশের মানুষ আর দেখতে চায় না, তাদের গ্রেফতার না করে সতর্ক করে দেওয়া হলো কেন আমাদের দাবি, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে অন্যথায় আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবো।