দেশের অর্থনীতি নিচে নেমে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে: আমীর খসরু

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে এসে স্থির হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটি কোনো অভিযোগ নয়, বরং বাস্তব চিত্র।

এই স্থবিরতা কাটাতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই

৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক

পুঁজিবাজার অকার্যকর হওয়ায় সবাই ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে

এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভিয়েতনাম ও চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ সমস্যায় পড়েছে। অথচ বাংলাদেশ তার চেয়ে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।’

মঙ্গলবার, (২০ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর বনানীর এক হোটেলে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

সাবেক এ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনীতির এই স্থবিরতা কাটাতে হলে ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতির বিকল্প নেই। বিনিময় হার, পুঁজিবাজার কিংবা আমদানি-রপ্তানি সবক্ষেত্রেই বাজারকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে। যে কোনো ধরনের বিনিয়োগই পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। সব বিনিয়োগকে রপ্তানিমুখী হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মূল বিষয় হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও পণ্যের ওপর বিশ্বাস। সেই আস্থা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’

আমীর খসরু বলেন, ‘বাংলাদেশের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো নীতিগত বিকৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এত বেশি আইন ও বিধিনিষেধ যুক্ত হয়েছে, যার অনেকগুলোই মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি হয় বাজারব্যবস্থা রাখবেন, নয়তো রাখবেন না, দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়। বাজারের ওপর আস্থা রাখতে হলে বাজারকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে।’

পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট প্রকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সংকট দূর করতে হলে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ বা ডি-রেগুলেশন এবং উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে। বাজারের ওপর এই বিশ্বাসই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।’

একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এ নেতা। যেসব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও হিসাবরক্ষক আর্থিক বিবরণী তৈরি করেন, তাদের কাজের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা যেন সঠিক ও বাস্তব আর্থিক চিত্র দেখতে পান, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া ‘গারবেজ অ্যাকাউন্ট’ বা সাজানো হিসাব পরিষ্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর হিসাব সাজিয়ে সমস্যা ঢাকার কোনো মানে নেই। এতে সংকট আরও গভীর হয় এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়ে।’

খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, ‘বর্তমানে যে ৩৫ শতাংশ বা তার কাছাকাছি খেলাপি ঋণের হার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রকৃত চিত্র সামনে এলে এই হার ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করা। পরিস্থিতি খারাপ হলে তা গোপন না করে বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে হবে। এজন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রভিশন, প্রয়োজনে ঋণ অবলোপন (রাইট-অফ) এবং সর্বাগ্রে একটি পরিষ্কার ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যালান্স শিট।’

বিএনপির জ্যেষ্ঠ এ নেতা আরও বলেন, ‘বাজারের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং বাজারকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তা করা গেলে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। ভোটের পূর্ব প্রস্তুতি চলছে। আমরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এবং আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো নির্বাচনি প্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। গত ১৬, ১৭ বা ১৮ বছর পর নাগরিকরা তাদের ভোট দিয়ে এমন একটি সরকার গঠন করার সুযোগ পাবেন, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।’

বিশ্বজুড়ে অনেক ‘ফান্ড ম্যানেজার’, যাদের মধ্যে অনেকে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য অপেক্ষা করছে মন্তব্য করে সাবেক এ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এজন্য আমাদের কঠোর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত, তাই আমাদের ডি-রেগুলেশন এবং উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে। মোট দেশজ উৎপাদনের( জিডিপি) তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন অনুপাত মাত্র ১০ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তা জিডিপির দ্বিগুণ, ভারতে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ।’

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যেও জিডিপির তুলনায় কিছুটা এগিয়েছে, যা অবাক করার মতো মন্তব্য করে আমীর খসরু বলেন, ‘অবাক করার মতো বিষয় হলো, একটি অকার্যকর পুঁজিবাজার নিয়েও অর্থনীতি এতদূর এগিয়েছে! পুঁজিবাজার অকার্যকর হওয়ায় সবাই রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যার ফলে শর্ট-টার্ম ডিপোজিট (স্বল্প মেয়াদি আমানত) ও লং-টার্ম লেন্ডিংয়ের(দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ) দিকে গিয়েছে ব্যাংকগুলো।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘ব্যাংকগুলো থেকে যথেচ্ছ ঋণ নেয়া হয়েছে। যার কিছু অংশ ব্যবসায় ব্যবহৃত হলেও কিছু অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, যা আর্থিক খাত বিপর্যস্ত করে তুলেছে। অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের বেশিরভাগ এসব সমস্যার মূল কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। একটি মুক্ত, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন- এই প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী।’

পুঁজিবাজার কার্যকর না হওয়ায় সরকার আইএমএফের কাছ থেকে অনেক শর্তে ঋণ নিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, ‘উড়োজাহাজ কেনা ও রেলওয়ের বড় খাতে বিনিয়োগের জন্য এখন বিদেশে ধার করতে যেতে হয়। এত বড় অর্থায়নের জায়গা নেই। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা রেলওয়ের মতো সরকারি সংস্থাগুলো মিউনিসিপ্যাল বন্ড বা সার্বভৌম বন্ড ছেড়ে বিমান কেনা বা বড় প্রকল্পের অর্থায়ন করতে পারতো। এমনকি জেপি মরগানের মতো প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের জন্য বন্ড ছাড়তে আগ্রহী হতে পারে, যদি আমরা সঠিক পরিবেশ তৈরি করতে পারি। ভিয়েতনাম, চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ সমস্যায় পড়েছে। বাংলাদেশ তার চেয়ে অনেক সুবিধাজনক স্থানে আছে। প্রতিনিয়ত বিদেশিরা বাংলাদেশে আসছেন, কিন্তু তারা বিনিয়োগ করছেন না। নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন।’

সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে সরকারি কয়টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শুধু সরকারি নয় বেসরকারি ভালো প্রতিষ্ঠানও তালিকাভুক্ত করতে হবে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে চলতে দিতে হবে। তাদের আনতে (তালিকাভুক্ত) হলে ভিন্ন ধরনের প্যাকেজ দিতে হবে।’

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

» ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের ১৩ উপজেলার ১১টি আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী ৬৭ জন

» নির্বাচন ঘিরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, গণভোট নিয়ে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায়: সিপিবি

সম্প্রতি