দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর প্রথমবারের মতো সশরীরে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপি সরকার গঠন করলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা হবে
নির্বাচনের আগেই যারা মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা মানুষকে কীভাবে ঠকাবে তা সহজেই অনুমেয়
দিল্লি বা পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ
তাদের ভূমিকা ৫০ বছর আগেই জাতি দেখেছে
জামায়াতের বিভ্রান্তিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিক তা আমরা চাই না, সরকারের কাছে অনুরোধ তাদের নিরাপত্তা প্রয়োজনে তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়া হোক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আধ্যাত্মিক নগরী সিলেট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর প্রচারণা শুরু করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার, (২২ জানুয়ারী ২০২৬) সিলেট থেকে ফেরার পথে দিনব্যাপী কমপক্ষে সাতটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান। এসব জনসভায় তিনি দেশ পুনর্গঠন, ধর্মীয় ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি এবং আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেন।
সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত প্রথম নির্বাচনী জনসভায় এবং বিকেলে মৌলভীবাজারের শেরপুরে আয়োজিত সমাবেশে তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।’ তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাল-সবুজ রঙের একটি বাসে করে তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের সভাস্থলে পৌঁছান। তাকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকেই সিলেট, সুনামগঞ্জ ও আশপাশের জেলা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমবেত হতে থাকেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নেতাকর্মীদের মাথায় ছিল ধানের শীষের ছবি সংবলিত টুপি এবং হাতে দলীয় পতাকা।
মঞ্চে উঠে তারেক রহমান উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এবং সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কুশল বিনিময় করে বলেন, ‘আপনারা ক্যামনে আছাইন (কেমন আছেন), ভালানি (ভালো তো)?’ জনসভায় তিনি প্রায় ২৩ মিনিট বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে গত ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন, গুম, খুন এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র। তিনি বলেন, যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি দেশের মানুষই হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক সব ক্ষমতার উৎস। সেজন্যই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্বাস করি।
নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকা-ের (নাম উল্লেখ না করে) তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগেই একটি দল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে ‘জান্নাতের টিকেট’ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা সুস্পষ্ট শিরক।
জনসভায় তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, ‘কাবা শরিফের মালিক কে? এই পৃথিবী, সূর্য-নক্ষত্র, বেহেশত ও দোজখের মালিক কে?’ উপস্থিত জনতা সমস্বরে উত্তর দেয়, ‘আল্লাহ’। এরপর তারেক রহমান বলেন, ‘যার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। অথচ একটি দল নির্বাচনের আগেই বলছে ‘এই দেব, ওই দেব’, এমনকি জান্নাতের টিকেটও দেব। যেটার মালিক মানুষ নয়, সেটার প্রতিশ্রুতি দেয়া মানে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা মুসলমান, তাদের দিয়ে এরা শিরক করাচ্ছে। এরা মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। নির্বাচনের আগেই যারা ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা মানুষকে কীভাবে ঠকাবে, তা সহজেই অনুমেয়।’
# ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও ষড়যন্ত্রের হুঁশিয়ারি #
বক্তৃতায় তারেক রহমান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। সে সময় অনেকের ভূমিকা আমরা দেখেছি। যাদের ভূমিকার কারণে লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, মা-বোনেরা নির্যাতিত হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ তাদের চিনে রেখেছে।’
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বলেন, ‘যাদের ভূমিকা ৫০ বছর আগেই জাতি দেখেছে, নতুন করে তাদের দেখার কিছু নেই। তারা যদি দেশের পক্ষে থাকতো, তবে এত মানুষকে প্রাণ দিতে হতো না।’ তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেন, এই অপশক্তি এবং কুচক্রী মহল দেশে ও বিদেশে বসে পুনরায় ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট ডাকাতির খবর সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যারা দেশ থেকে পালিয়েছে, তারা যেভাবে ভোট ডাকাতি করেছিল, ঠিক একইভাবে আবার সেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’
মৌলভীবাজারের সমাবেশে তারেক রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি একটি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি জামায়াতের (নাম উল্লেখ না করে) বিভ্রান্তিমূলক কর্মকা-ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সরকারের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরোধ, তাদেরকে (ওই দলকে) যে প্রটোকল বা নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনে তিনগুণ বাড়িয়ে দিন।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং মানুষ সত্যটা জানতে পেরে তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হচ্ছে। আমরা চাই না, মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিক বা কিছু করে বসুক। তাই তাদের নিরাপত্তা বাড়ানো প্রয়োজন।’
# ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ ও আগামীর পরিকল্পনা #
তারেক রহমান তার বক্তব্যে ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ স্লোগানের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ মানে শুধু গণতন্ত্র রক্ষা নয়, এর অর্থ হলো মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।’ তিনি বলেন, দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রা এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে ভোট দেয়ার মাধ্যমেই সেই যাত্রা শুরু হবে।
আগামী দিনের সরকার গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরে এই তরুণ রাজনৈতিক বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি মানুষকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলা। আমরা চাই বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে, যাতে তারা দেশে ও বিদেশে মাথা উঁচু করে কাজ করতে পারে।’
তিনি প্রবাসীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সিলেটের অধিকাংশ মানুষ লন্ডন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছে। আমরা সরকারিভাবে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবো, যাতে মানুষ দক্ষ হয়ে বিদেশে যেতে পারে এবং সেখানে গিয়ে ভালো রোজগার করতে পারে।’
# জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি: ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড #
তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও নারীদের জন্য বিশেষ কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত হলে কৃষক ও নারীদের জন্য বিভিন্ন কার্ড চালু করবো। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড এবং হেলথ কার্ড।’
মৌলভীবাজারের সমাবেশে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ‘ধানের শীষের বিজয় হলে চা শ্রমিক ও নারীদের ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য কিংবা নগদ অর্থ সহায়তা দেয়া হবে, যাতে সংসার চালাতে সুবিধা হয়। কৃষকদের দেয়া হবে কৃষি কার্ড, যা দিয়ে তারা কৃষি ঋণ, সার ও বীমা সুবিধা পাবেন।’ এছাড়া কৃষির উন্নয়নে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
# গুম ও নির্যাতনের বিচার #
জনসভায় বারবার উঠে আসে গত ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুম ও খুনের প্রসঙ্গ। বিশেষ করে সিলেটের সন্তান ও বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার বিষয়টি আবেঘন পরিবেশে স্মরণ করা হয়। তারেক রহমান বলেন, ‘ইলিয়াস আলী, দিদার, জুনায়েদসহ হাজারো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে অধিকার অর্জন করেছি, চব্বিশের গণআন্দোলনে শুধু সিলেট শহরেই ১৩ জন জীবন দিয়েছে। এই আত্মত্যাগ আমরা বৃথা যেতে দেব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ধানের শীষ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কোনো মানুষ গুমের শিকার হয়নি, খুনের শিকার হয়নি। মানুষ মন খুলে কথা বলতে পেরেছে এবং সরকারের সমালোচনা করতে পেরেছে।’
# মৌলভীবাজারে প্রার্থী পরিচয় ও নির্বাচনী আমেজ #
সিলেটের জনসভা শেষে তারেক রহমান সড়কপথে মৌলভীবাজারে যান এবং সেখানে শেরপুরের আইনপুর খেলার মাঠে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি মৌলভীবাজারের চারটি সংসদীয় আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের ‘আগামী দিনের উন্নয়নের দূত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পরিচয় করিয়ে দেয়া প্রার্থীরা হলেন- মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ি) আসনে নাসির উদ্দিন মিঠু, মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে শওকতুল ইসলাম, মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনে নাসের রহমান এবং মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল) আসনে মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। মির্জা ফখরুল তার বক্তব্যে বলেন, ‘আজকের লড়াই অপশক্তির বিরুদ্ধে। যারা ১৫ বছর ধরে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিয়েছে, গুম হয়েছে, তাদের ত্যাগের বিনিময়েই আজকের এই নতুন বাংলাদেশের যাত্রা।’
তারেক রহমান তার বক্তব্য শেষ করেন এই বলে যে, চব্বিশের ৫ আগস্ট জনগণ প্রমাণ করেছে ঐক্যবদ্ধ থাকলে যে কোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব। তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে ভোট দিয়ে গণতন্ত্র ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানান। মৌলভীবাজারের কর্মসূচি শেষে তিনি পরবর্তী নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন।