‘বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট’ এবং ‘কষ্টে থাকা মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিয়েছেন, সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তারেক রহমানের বক্তব্যের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বস্তিবাসীরা এসব ‘মিথ্যা আশ্বাস’ বুঝতে পারেন। তারা ফ্ল্যাটের আশায় নয়, দেশের স্বার্থে ন্যায়ের পক্ষে ভোট দেবেন। বৃহস্পতিবার, (২২ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর আমিরের নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিয়ে বক্তব্যে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। বিএনপির দুই হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ড পেতে এক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে কিনা, বক্তব্যে এই প্রশ্নও রাখেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রার্থীও। এই জোটে যোগ দিয়েছে বৈষ্যম্যবিরোধীদের গড়া নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি।
দুপুরে ঢাকার মিরপুর-১০ এ আদর্শ স্কুল মাঠে (শফিকুর রহমানের আসন) সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ প্রচার শুরু হয়। বিকেলে ওই সমাবেশে বক্তব্যে রাখেন এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম।
বিকেল ৫টায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য শুরুর আগে ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থি নাহিদ ইসলাম বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের শুরুতে জামায়াত আমিরকে ‘১০ দলীয় জোটের প্রধান কা-ারি’ হিসেবে মন্তব্য করেন এনসিপির এই নেতা। জামায়াত আমিরকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সেনানি’ এবং ‘কারা নির্যাতিত মজলুম নেতা’ হিসেবেও সম্মোধন করেন তিনি।
সমাবেশে জামায়াতের আমিরও বক্তব্য রাখেন। নিজের বক্তব্যের মাঝখানে বিরতি নিয়ে তিনি তার দলের দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন এনসিপি প্রধানের হাতে। এসময় শিফিকুর রহমান বলেন, “আমি ইনসাফের প্রতীক দাড়িপাল্লা তুলে দিচ্ছি, এতে কলিও আছে।”
নাহিদ ইসলাম হাসিমুখে তা হাতে নিয়ে মঞ্চে নিজের আসনে গিয়ে বসেন। এরপর জামায়াত আমির আরো কয়েকজনের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন।
ফ্ল্যাট, ফ্যামিলি কার্ড
গত মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার মহাখালীতে টিঅ্যান্ডটি কলোনির মাঠে বিএনপির সাবেক প্রধান খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত দোয়া মাহফিলে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে নিজের নির্বাচনি আসনের (ঢাকা-১৭) জন্য কড়াইল বস্তিবাসীর কাছে দোয়া চান তিনি। সঙ্গে বস্তিবাসীর জীবনমান উন্নয়নে ফ্ল্যাট ও ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আল্লাহ রহম করলে আপনারা এখানে যে থাকার কষ্ট করছেন, সেই কষ্টটি আমরা ধীরে ধীরে সমাধান করতে চাই। এখানে উুঁচ উুচু বড় বড় ভবন করে দিতে চাই। এখানে যে মানুষগুলো থাকেন, তাদের নাম রেজিস্ট্রি করে তাদের প্রত্যেকের নামে আমরা ফ্ল্যাট দিতে চাই।” সমালোচনা করে বৃহস্পতিবার মিরপুরে নির্বাচনী সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, “বস্তিবাসী ফ্ল্যাট চায় না, তারা চায় নিরাপদ জীবন, যা বস্তিতে থেকেও সম্ভব। অতীতে যারা বস্তিবাসীকে ফ্ল্যাট দিতে চেয়েছেন, তারা নির্বাচনের পর তাদের উচ্ছেদ করতে নেমেছেন।” নাহিদ আরও বলেন, “বস্তিবাসী এসব মিথ্যা আশ্বাস এখন বুঝতে পারে। তারা ফ্ল্যাটের আশায় নয়, দেশের স্বার্থে ন্যায়ের পক্ষে ভোট দেবে।”
বিএনপি চেয়ারম্যান মহাখালীতে টিঅ্যান্ডটি কলোনির মাঠে বলেছিলেন, “আজ এখানে হাজার হাজার মা-বোন বসে আছেন। সারাদেশে মা-বোনেরা কষ্টের মধ্যে আছেন। আল্লাহ যদি আমাদের তৌফিক দেন আমরা সেই মা-বোনদের জন্য, তারা যাতে স্বচ্ছলভাবে চলতে পারেন, তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড নামে একটি কার্ড দিতে চাই। কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড দিতে চাই।”
*‘নাকি ঘুষ দিতে হবে’*
তারেক রহমানের এই বক্তব্যের প্রসঙ্গ ধরে বৃহস্পতিবার মিরপুরে নাহিদ ইসলাম বলেন, “যে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার ফ্যামিলি কার্ডের কথা বিএনপি বলছে, তা কারা পাবেন? যাদের প্রয়োজন তারা পাবেন কি, নাকি ২ হাজার টাকার কার্ড পেতে এক হাজার টাকা ঘুষ দিতে হবে? একদিকে তারা কার্ড দেওয়ার কথা বলছেন, আরেক দিকে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিচ্ছে। যাদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে, তারা তো আবার ক্ষমতায় গিয়ে লুট করবে। জনগণের টাকা মেরে খাবে, এমন ব্যক্তিদেরই নমিনেশন দিয়েছে দলটি।”
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্দেশ্যে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, “কোনো দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। আমরা নির্বাচন কমিশনকে স্বরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা মাঠে আছি। কোনো অন্যায় সহ্য করা হবে না।”
বক্তব্যের শেষ দিকে গণভোটের বিষয়ে নাহিদ বলেন, “এবারের নির্বাচন কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নয়। একটি গণভোটও আছে। আমরা সবাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব। বৈষম্য, চাঁদাবাজি, অন্যায়, জুলুম ও আধিপত্যবাদকে না বলব। আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম, সেই লক্ষ্য অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী করে আমরা সেই আন্দোলনকে বিজয়ের উল্লাসে রূপান্তর করব।”
*সব জায়গায় চাঁদাবাজি*
সমাবেশে জামায়াতের আমির বিএনপি প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা ওই ধরনের কোনো কার্ডের ওয়াদা দিচ্ছি না। দুই হাজার টাকা দিয়ে একটা পরিবারের কোনো কিছু সমাধান হবে? আর আমার ভাই নাহিদ ইসলাম বলেছে, তাতে আবার ভাগ বসিয়ে দেওয়া হবে; ‘খাজনা আগে, তারপর অন্যটা’, ‘দুই হাজারের এক হাজার আমার খাজনা- আমাকে আগে দাও, তারপরে তোমারটা তুমি বুঝে নাও’। তাও না কাল্পনিক কিছু মানুষের চরিত্র এঁকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে, বেকারের হাতে নয়।”
তিনি বলেন, “প্রত্যেকের জন্য ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে চাই আমরা।” কারও সমালোচনা করতে চান না উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, “যারা নিজের দলের লোকজনকে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি থেকে বিরত রাখতে পারবে আগামীর বাংলাদেশ তারাই গড়বে। দোকান-গাড়ি-ফুটপাত সব জায়গায় চাঁদাবাজি হয়, সেটা আর হতে দেয়া হবে না।”
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মোবারক হোসাইন, ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাশেম, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী আব্দুল বাতেন, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামান বক্তব্য দেন।