দফায় দফায় বৈঠক, অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তার পর অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’। সমঝোতা অনুযায়ী ৩০০ আসনের মধ্যে জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী ২১৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, আর বাকি ৮৫টি আসন শরিক দলগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা সত্ত্বেও অন্তত ৬-৭টি আসনে জোটের শরিকরা একে অপরের বিরুদ্ধে ‘উন্মুক্ত’ লড়াইয়ে নামছে।
জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী ২১৫টি আসনে প্রার্থী দিচ্ছে। এর বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি আসন পেয়েছে। জোটের শরিক হয়েও শেষ পর্যন্ত কোনো আসন পায়নি জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। তবে আসন না পেলেও তারা জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাকি ৭টি আসনে কোন দলের প্রার্থীকে রেখে, কোন দলের প্রার্থীকে বসিয়ে দেয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান।
শুরুতে এই জোটটি ১১ দলীয় সমঝোতার ভিত্তিতে এগোচ্ছিল। গত ১৫ জানুয়ারি ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণার সময় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ‘আসন বন্টনে ইনসাফ না পাওয়ার’ অভিযোগ তুলে গত ১৬ জানুয়ারি ইসলামী আন্দোলন জোট ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তাদের ছেড়ে যাওয়া এই ৪৭টি আসনের মধ্যে ৩৬টি নিজেদের দখলে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি ১১টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ১টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৩টি বাড়তি আসন পেয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সৌজন্যতার দৃষ্টান্ত হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুল করীমের বরিশাল-৬ আসনে কোনো প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোট।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় শেষ হলেও কয়েকটি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারেনি জোট। ফলে অন্তত ৬টি আসনে শরিক দলগুলো নিজস্ব প্রতীকে উন্মুক্ত নির্বাচনে অংশ নেবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোটগতভাবে ২৩টি আসন পেলেও তারা মোট ২৯টি আসনে রিকশা প্রতীকে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। অতিরিক্ত এই ৬টি আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ-৩ ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনে খেলাফত মজলিস, মৌলভীবাজার-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এনসিপি, ফেনী-২ আসনে এবি পার্টি এবং ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর সঙ্গে তাদের উন্মুক্ত লড়াই হবে। একইভাবে খেলাফত মজলিসও তাদের প্রাপ্ত ১২ আসনের বাইরে আরও ৫টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
এবিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘যেহেতু প্রত্যাহারের সুযোগ নেই, তাই সমন্বয় হওয়া প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে অন্য প্রার্থী বসে যাবেন। আর কিছু আসনে উন্মুক্ত লড়াই হতে পারে, যা জোট নেতারা ঠিক করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন আমাদের জোটের শরিক, তারা কোনো আসন ছাড়াই জোটের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করবে। এখন পর্যন্ত কোনো আসন তাদের দেয়া হয়নি, সম্ভাবনাও নাই।’
জোটের বৃহত্তর স্বার্থে পঞ্চগড়-১ ও পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান। তিনি তার ফেসবুকে জোটের শরিক এনসিপি ও জামায়াতের প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার জানিয়েছেন, তাদের ৩টি আসনে কোনো সমস্যা নেই এবং তারা জোটের প্রার্থী হিসেবেই লড়বেন। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা আরও ৫টি আসন চেয়েছিলাম। অন্য দলগুলো ছাড় না দেয়ায় আমরাও প্রার্থী দিয়েছি।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, জোটের সব আসনে প্রার্থী মোটামুটি চূড়ান্ত এবং শীঘ্রই আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।