সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ‘মিলেমিশে দেশ গড়ার’ ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এজন্য তিনটি শর্ত দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের বড় মাঠে ১০ দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন শফিকুর রহমান।
আমরা চাই উত্তরবঙ্গ হোক আমাদের কৃষি শিল্পের রাজধানী
সৈয়দপুর এয়ারপোর্টকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হবে
দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি
তিনি বলেন, ‘ঠাকুরগাঁওবাসী এর আগে দফায় দফায় আপনারা অনেককেই আপনাদের মূল্যবান ভোট-ভালোবাসা-সমর্থন দিয়েছেন। এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নয়, এবার এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষের ১০ দলের একটা ঠিকানা- সেই ঠিকানাকে আপনারা ভোট দেবেন ইনশাআল্লাহ। আমরা একা বাংলাদেশ গড়তে পারবো না। আমরা মনে করি, ঐক্যবদ্ধ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেই বাংলাদেশ গড়তে হবে ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ঘোষণা করেছি - আল্লাহ আমাদের কামিয়াবি দিলে, সফলতা দিলে, আমরা কাউকে বাদ দেব না। আমরা সবাইকে বলবো - আসেন, মিলেমিশে আমরা বাংলাদেশ গড়ে তুলি। তিনটা শর্ত শুধু মেনে নিতে হবে। ১. কোনো দুর্নীতি নিজে করবেন না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে বগলের নিচে আশ্রয় দেবেন না। ২. গরিব-ধনী সবার জন্য, নারী-পুরুষ সবার জন্য, সব ধর্ম সব বর্ণের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং সেই বিচার হবে সবার জন্য সমান। সেই বিচারে কেউ রাজনীতিবিদি হিসেবে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর বিচার হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে, কোনো বে-ইনসাফি বিচার আর বিক্রি হবে না।’
তৃতীয় শর্তের কথা বলতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘চুয়ান্ন বছরের বস্তাপঁচা রাজনীতি- যেটা দুঃশাসন আর দুর্নীতিতে দেশকে ডুবিয়ে ফেলেছে। চাঁদাবাজদের রমরমা ব্যবসা আর জনগণের জান যাওয়ার উপক্রম। এসব কিছু বদলাতে হলে বৈষম্য বদলাতে হলে- অঞ্চলে অঞ্চলে বৈষম্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য, পরিবারে পরিবারে বৈষম্য, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে বৈষম্য, দলে দলে বৈষম্য, সব বৈষম্যের আমরা কবর রচনা করতে চাই।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘এজন্য প্রয়োজন সংস্কারের, সব প্রস্তাব গণভোটে দেয়া হয়েছে, সেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিয়ে গণভোটকে পাস করিয়ে দেয়া।’ তিনি বলেন, ‘কোনো একক দলের শাসন আমরা চাচ্ছি না আর। আমরা এখন জনগণের শাসন চাই। আলেম-ওলামা থাকবেন, এদেশের দক্ষ মানুষগুলো থাকবে, দেশপ্রেমিক দলগুলো আসবে- যারা দেশকে ভালোবাসে, কোনো আধিপত্যবাদকে যারা মেনে নেবে না; তাদের সবাইকে নিয়ে আগামীর বাংলাদেশ গড়বো ইনশাআল্লাহ। সেই দিনটার জন্যই জাতি অপেক্ষা করছে। দফায় দফায় অনেককে সুযোগ দিয়ে আপনারা দেখেছেন। এবার একটু ওই মানুষগুলোকে সুযোগ দিন- যারা নিজেরা চাঁদাবাজি করে না, বরঞ্চ চাঁদাবাজদের রুখে দেয়ার জন্য শপথ নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, যদি আমরা আল্লাহর মেহেরবাণীতে আপনাদের ভালোবাসায় নির্বাচিত হই, তাহলে আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা ইনশাআল্লাহ গোটা উত্তরবঙ্গকে বাংলাদেশের গৌরবের কৃষি রাজধানীতে পরিণত করবো ইনশাআল্লাহ। এখানে যেখানে এয়ারপোর্ট হওয়ার, হবে। সৈয়দপুর এয়ারপোর্টকে আন্তর্জাতিক মানে ইনশাআল্লাহ উন্নীত করা হবে; যাতে শিল্পের বিকাশ, অ্যাগ্রো-বেজড ইন্ডাস্ট্রি তথা কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ এবং তার পণ্য সারাদেশে এবং বিশ্বে ছড়ায়ে পড়ে সেজন্য কমিউনিকেশন ব্যবস্থাকে উন্নত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আর দেখতে চাই না বেকারত্বের কষ্ট বুকে চেপে এখানকার সন্তানেরা রাজধানী ঢাকায় গিয়ে গলিতে গলিতে কষ্ট করবে, ঘুরাঘুরি করবে, একটা চাকরি পাবে না। আমরা চাই, তাদেরকে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তুলে উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যেকটি ঘরকে এক একটি ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা পরিণত করতে চাই। বিশ্বে এরকম বহু দেশ আছে- জাপান আছে, ভিয়েতনাম আছে, চায়না আছে। তারা তাদের প্রত্যেকটি ঘরকে ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করেছে। তারা যদি পারে, আমরাও পারবো ইনশাআল্লাহ।’
* দিনাজপুর হবে সিটি করপোরেশন *
এদিকে শুক্রবার বাদ জুমা দিনাজপুর শহরের গোর-এ-শহীদ ময়দানে ১০ দলীয় ঐক্যজোট আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন শফিকুর রহমান। সরকার গঠনের সুযোগ পেলে দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের আশ্বাস দেন তিনি। জামায়াত আমির বলেন, ‘বৃহত্তর জেলা হিসেবে অনেক জায়গায়ই জেলা হেডকোয়ার্টার ও সিটি করপোরেশন হয়েছে। আপনারা কি সিটি করপোরেশন পেয়েছেন? পান নাই। কেন? আপনারা তাহলে কি বাংলাদেশের সৎ ভাই? এই সৎ ভাইকে মানুষ সম্পত্তি দিতে চায় না, তার অধিকার দিতে চায় না। আমরা এই বৈষম্যকে খতম করবো ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যদি দেশ সেবার সুযোগ পায়, সরকার গঠনের সুযোগ পায়; আমরা আপনাদেরকে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে আশ্বস্ত করছি- দিনাজপুর শহরকে ইনশাআল্লাহ সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত করা হবে। সিটি করপোরেশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো উন্নয়ন অটোমেটিক্যালি দিনাজপুর শহর পেয়ে যাবে।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘প্রিয় দিনাজপুরবাসী, পাকিস্তান আমলে যে ১৯টি বড় জেলা ছিল, সেই ১৯ জেলার মধ্যে দিনাজপুর ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। দিনাজপুরকে গণ্য করা হয় বাংলাদেশের শস্য ভা-ার হিসেবে। সারা বাংলাদেশের খাদ্যের তিন ভাগের এক ভাগ যোগান দেয় বৃহত্তর দিনাজপুর। এই জেলা নিজের উর্বর মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে বাংলাদেশকে যুগের পর যুগ দিয়ে চললেন। বাংলাদেশ দিনাজপুরকে কী দিল?’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘একদল দুর্বৃত্ত বলে আমরা যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পাই, সরকার গঠন করি, মা-বোনদেরকে আমরা ঘরে বন্দি রাখবো। যারা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আজকে নারী সমাজের ভালোবাসা এবং সমর্থন দেখে ভীত সন্ত্রস্ত, তারাই এসব কথা বলে আমাদের মা-বোনদেরকে তারা ধোঁকা দিতে চায়। তারা আমাদের মা-বোনদের সঙ্গে কী আচরণ করে, আমাদের মা-বোনরাই সাক্ষী, আমাদের বলতে হবে না। মা-বোনরা তাদেরকে ভালো করে চেনে। এরা আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করতো। এদেশের তরুণ যুবসমাজ কোনোদিন জামায়াতকে সমর্থন করবে না। এদেশের নারী সমাজ কখনো জামায়াতকে মেনে নেবে না।’
তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর ৩৬ জুলাইয়ের পর বাংলাদেশে সর্ববৃহৎ পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই নির্বাচনগুলোতে আমাদের মেয়েরা প্রমাণ করেছে যে- তারা ছেলেদের চাইতেও ছাত্রশিবিরকে তাদের আস্থার জন্য বেশি পছন্দ করে। ওদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে- ‘তোমার তো ড্রেস-টেস ঠিক নাই, তুমি ছাত্রশিবিরকে ভোট দিবা কেন?’ বলেছে যে, ‘ছাত্রশিবিরের কাছে আমরা নিরাপদ, এজন্য ছাত্রশিবিরকে ভোট দেব’। মায়েরাও আজকে তাই বলছেন- ‘জামায়াতে ইসলামীর কাছে আমরা নিরাপদ, এজন্যই আমরা জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নেব’।”
দিনাজপুরবাসীর উদ্দেশে শফিকুর বলেন, ‘এখানে প্রচুর পরিমাণ আম উৎপাদন হয়, লিচু উৎপাদন হয়; তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করতে হয়। আমি আগেই বলেছি, এর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে এবং সেখানে আরও উন্নতমানের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হবে। কী ইন্ডাস্ট্রি? আমের রস, লিচুর রস উচ্চ মূল্যে বিদেশে বিক্রি হয়। আমাদের দেশে তার ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি না থাকার কারণে কৃষক অস্থির হয়ে যায়- কেমনে তাড়াতাড়ি বিক্রি করে দেবে। এজন্য সে তার উৎপাদিত ফসলের ও ফলের সঠিক মূল্য পায় না। ‘মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের পেট মোটা হয় খাইতে খাইতে। আমরা এখানে তৃণমূলে ইনশাআল্লাহ সেই ইন্ডাস্ট্রিগুলো গড়ে তুলবো। লাভ দুটি হবে- কৃষকরা উৎসাহিত হবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে; আর বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে আমাদের যুবকদের।’