ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে জনমনে ‘সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্ম নিতে বাধ্য হবে’ বলে মনে করে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। বাম ও প্রগতিশীল ঘরানার দলগুলোর এই জোট বলেছে, বড় দলের অনেক প্রার্থী ভোটের আচরণবিধি মানছেন না। ‘স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক দল’ নির্বাচনে ধর্মের নাম ব্যবহার করে ‘বেহেস্তের টিকেট’ বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন জোটের নেতারা।
নির্বাচনী ইশতেহার দিলো গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট
অভ্যুত্থানের পর মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাও নিশ্চিত করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার: বজলুর রশীদ ফিরোজ
শুক্রবার,(২৩ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে ভোটের ইশতেহার তুলে ধরতে গিয়ে তারা এসব পর্যবেক্ষণ সামনে আনে। ইশতেহার ঘোষণা করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ।
ইশতেহারে প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনীকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করা; সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও মবসন্ত্রাস দমন এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ‘রাজনৈতিক শাখা’ বিলুপ্ত করাসহ রাষ্ট্র সংস্কারে ১৮ দফা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়। ইশতেহার তুলে ধরার আগে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেন বজলুর রশীদ ফিরোজ।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও সরকার এখনও সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেনি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নাই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বড় দলের ‘সবল’ প্রার্থীরা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলছেন। স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক দল নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার করে বেহেস্তের টিকেট বিক্রি করছে, যা আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন।’
গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকার ‘লা মেরিডিয়েন’ হোটেলে শিক্ষাবিষয়ক এক সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সেখানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, এ দেশের তরুণরা নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠন করেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ব্যালটে থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত তাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচিত হবেন।’
গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম আভাষ দেন, এবার ভোট গণনায় দেরি হতে পারে। সেদিন ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, ‘এ বছর সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি রয়েছে একটি রেফারেন্ডাম, রয়েছে পোস্টাল ব্যালট, যার কারণে ভোট গণনায় কিছু দেরি হতে পারে।’
প্রধান উপদেষ্টা ও তার প্রেস সচিবের বক্তব্যের সমালোচনা করে বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘খোদ প্রধান উপদেষ্টা যখন তার বক্তব্যে একটি দলের কয়েকজন পাস করবে এবং তাদের দুয়েকজন মন্ত্রীও হবেন বলে মন্তব্য করেন, তথা আগাম ভোটের ফল বলে দেন; তার প্রেস সচিব যখন বলেন, ‘এবার ভোট গণনায় সময় বেশি লাগবে’, তখন সুষ্ঠু ভোট নিয়ে জনমনে সন্দেহ-অবিশ্বাস জন্ম নিতে বাধ্য।’
গণমাধ্যমকে বজলুর রশীদ ফিরোজ জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তিনি আরও জানান, জোটের প্রার্থীদের মধ্যে ৬৫টি আসনে সিপিবি ও ৩৬ আসনে বাসদের প্রার্থী রয়েছেন। একজনের প্রার্থিতা এখনও আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
ইশতেহার তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছেন; আহত হয়েছেন ২৫ হাজারের বেশি। মানুষ শোষণ, বৈষম্য ও দুঃশাসন থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছিল। কিন্তু মুক্তি আসেনি। অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার দৃশ্যমান হয়নি। মব সন্ত্রাসে গোটা দেশ নাকাল।’
তিনি বলেন, ‘মাজার-খানকা, আখড়া-মন্দিরসহ ভিন্ন মত ও পথের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ, বাউলদের চুল কেটে দেয়া এবং কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়া, কথিত ধর্ম অবমাননার নামে হত্যা করে পুড়িয়ে দেয়াসহ বীভৎস হত্যাকাণ্ড চলছে। শুধু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটই নয়, অভ্যুত্থানের পর মানুষের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাও নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের কোনো চেষ্টাও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেনি।’
* যুক্তফ্রন্ট কেন জুলাই সনদে সই করেনি *
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ ৮ মাসের আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মর্মবস্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক প্রণীত জুলাই সনদে প্রতিফলিত হয়নি। দলসমূহের দেয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত করে সনদ রচনা করা হয়েছে। সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। সনদের অঙ্গীকারনামা অংশে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যেসব দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তারা কীভাবে সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে? অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, ‘জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না’। এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বহাল রেখে কমিশন প্রস্তাবিত মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকারসমূহ মূলনীতি হিসেবে যুক্ত করার কথা বলেছিলো যুক্তফ্রন্ট। কিন্তু কমিশন সেটা আমলে নেয়নি। সব দলের সর্বসম্মত প্রস্তাবগুলো নিয়ে সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে কেউই তাতে আপত্তি করতো না। কিন্তু সরকার ও ঐকমত্য কমিশন তা না করে সেটা চাপিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।’
*নির্বাচনী ইশতেহারে যা আছে*
‘রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন’ শীর্ষক অঙ্গীকারে জোটের তরফে বলা হয়েছে, তারা ভোটে নির্বাচিত হলে মতপ্রকাশ, সংগঠন, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ বাতিল করা; রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা এবং বিচার বিভাগ নির্বাহী প্রভাবমুক্ত করে সম্পূর্ণ স্বাধীন করার অঙ্গীকার করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
গণতান্ত্রিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার করে জোটের তরফে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এলে ‘অতীতের আলোচিত ও অনিষ্পন্ন বিচারসহ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার বন্ধে কাঠামোগত সংস্কার, দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনি সহায়তা জোরদার এবং সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও মবসন্ত্রাস দমনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট।
স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে এই জোট। তাদের অঙ্গীকার, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং নারীদের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নেতা রুবেল সিকদার, জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুন নুজহাত মনিষা ও সোনার বাংলা পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হারুন অর রশীদ।