image

বিশ্লেষণ

ডিম ছোড়ার ‘ইনসাল্ট পলিটিক্স’ কেন?

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

কোনো নেতা বা ভোটপ্রার্থীকে ডিম ছোড়া কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়। বরং রাজনীতির ইতিহাসে একধরনের প্রতীকী সহিংসতা। আদিম মানব-মনস্তত্ত্বে দেখা গেছে, অপমান মানে হচ্ছে আধিপত্যের লড়াই। আদিম সমাজে ‘শারীরিক আঘাত’ই একমাত্র অস্ত্র ছিল না। প্রাইমেট তথা বানর, শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে দেখা যায়, তারা কারো দিকে খাবার ছুড়ে মারছে। কখনও মল নিক্ষেপ করছে বা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। এসবের পেছনে রয়েছে প্রতিপক্ষকে আধিপত্যের জোরে নিচে নামানো। সে হিসেবে

ডিম ছোড়া আসলে আধুনিক সভ্য সমাজে স্ট্যাটাসের অবনতি ঘটানো। মনোবিজ্ঞানের ব্যাখায় বলা যায়, ডিম তখনই ছোড়া হয় যখন রাষ্ট্রীয় দমনের বিপরীতে প্রবল ক্ষোভ বিদ্যমান। আবার পূর্ণ সহিংসতাও বৈধ নয়, অথচ নিজেকে যেন ‘খুনি’ মনে না হয়। শেষ অবধি তা গিয়ে দাড়ায় কম ঝুঁকির আগ্রাসন।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিম ছোড়ার প্রবণতা এসেছে মূলত পশ্চিমা গণতন্ত্রের একেবারে গোড়ার দিকের প্রতিবাদ-সংস্কৃতি থেকে। ইউরোপে ১৮–১৯ শতকের দিকে বিশেষ করে ব্রিটেনে নির্বাচনী জনসভায় প্রার্থীদের দিকে ডিম, টমেটো, পচা ফল ছোড়া হতো। শ্রমিক বা বঞ্চিত জনগোষ্ঠী সরাসরি হামলা না করে, নেতাদের দিকে এসব ছুড়ে মেরে অপমান করতো। এভাবে প্রকাশ্যে অসম্মান করার মধ্য দিয়ে প্রবল বার্তা দিতো ভোটাররা। একইচিত্র দেখা যেত ১৯৬০–৭০ দশকের দিকে আমেরিকায় ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে। মার্কিন রাজনীতিবিদদের দিকে অমারণাস্ত্র ডিম–টমেটো ছুড়ে মারা হতো। যার মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের বার্তা ছিল, “আমরা তোমাকে মারছি না, কিন্তু তোমার নৈতিক বৈধতা মানছি না।”

আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিম ছোড়াও অতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক সহিংসতার মাধ্যমে চলে আসছে। এখানে ডিমের চেয়ে মারাত্মক অস্ত্র, লাঠি, পেট্রোল বোমা, আগুন ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ছাপিয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির আদলে ডিম ছোড়ার ঘটনায় দুটো সম্ভাবনা দেখা যায়। প্রথমত, ডিম ছোড়ার ঘটনা সহিংসতার উচ্চস্তর থেকে একধাপ নিচে নেমে আসা। মারধর-হত্যার মতো অপরাধের দিকে না গিয়ে প্রতীকী সহিংসতা দেখানো। পর্যবেক্ষণে বলা যায়, ডিম তখনই ছোড়া হয় যখন মতপ্রকাশের নিরাপদ জায়গা থাকে না, রাজনৈতিক কোনো বিতর্কের জায়গা থাকে না, নির্বাচনী মাঠ সমান নয়। ঠিক তখনই অপমানই হয়ে ওঠে রাজনীতির ভাষা।

আবার একবার ডিম ছুড়ে মারা মানে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদের বার্তা।তবে বার বার ডিম ছোড়া অর্থ রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর আক্রমণ। উদ্দেশ্য থাকে কাউকে ভয় দেখানো, হাস্যকর বানানো, জনসমক্ষে নৈতিক অবস্থান দুর্বল করা। যা নির্বাচনী রাজনীতিতে চরিত্রকে কলঙ্কিত করার মোক্ষম উপায়। নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও এমন প্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে এ ধরনের ঘটনা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ হিসেবে মানা যায় না। চরম সহিংসার সঙ্গে তুলনা করা না গেলেও এটা অস্বাস্থ্যকর গণতান্ত্রিক চর্চার পথ। যা গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে সামনে আসে। এমন ঘটনায় থাকে না যুক্তি, বিতর্ক। ডিম ছোড়া বলে দেয়, সমাজ এখনো রক্ত দেখতে চায় না ঠিকই তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবেও দেখতে শিখেনি। এটা সভ্যতার মাঝামাঝি এক অস্বস্তিকর স্তর।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নেই রাজনীতি ছিল অপমান–আবেগ–সহিংসতার মিশ্রণ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো নৈতিকভাবে ন্যায্য থাকলেও প্রতিবাদের ভাষা ছিল আবেগপ্রবণ ও দ্বিধাহীন। ফলে রাজনীতির ভেতরে ‘শত্রুকে শুধু হারাতে নয়, নৈতিকভাবে ধ্বংস করার’ মাইন্ডসেটটা পরে দলীয় রাজনীতির ডিএনএ হয়ে উঠে। সত্যিকার অর্থেই দেশীয় রাজনীতিতে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক দর্শন আর নীতিনির্ভর বিতর্ক খুবই দুর্বল। বিপরীতে দলীয় পরিচয় আর নেতাভক্ত সংস্কৃতি শক্তিশালী। যখন আদর্শ থাকে না তখন অপমান আর ঘৃণাই হয়ে ওঠে রাজনীতির ভাষা। অনেকটা ‘তুমি ভুল নও—তুমি ঘৃণ্য’ ধরনের। আর সেখান থেকেই অপমানভিত্তিক রাজনীতির জন্ম।

ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে অপমান হয়ে উঠেছে শাসনের অস্ত্র। ব্রিটিশ আমলে শাসকরা স্থানীয় মানুষকে “অযোগ্য” প্রমাণ করতেন। প্রকাশ্য অপমান ছিল নিয়ন্ত্রণের কৌশল। যে সংস্কৃতি ব্রিটিশ থেকে প্রথমে পাকিস্তানি রাষ্ট্রে সেখান থেকে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোয় ঢুকে যায়। রাষ্ট্র বুঝে যায়, ‘অপমান করলে মানুষ ছোট হবে, তখন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। আজকের রাজনীতিও সেটাই অনুকরণ করছে। দেশে অপমানের জন্য রাজনৈতিক মূল্য খুব কম। মারধর করলে যেখানে ঝামেলা, হত্যা করলে বড় বিপদ, সেখানে অপমান করলে কিছু হয় না। যে কারণে অপমান হয়ে ওঠে সবচেয়ে নিরাপদ অস্ত্র।

মূলত, ‘ইনসাল্ট পলিটিক্স’ ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট পন্থা হয়ে ওঠে। গ্রাম–মহল্লা থেকে জাতীয় রাজনীতি অবধি যুক্তিতে জিততে সময়, সংগঠন গড়তে পরিশ্রম দরকার। অথচ অপমান করলে মুহূর্তেই শত্রু বানানো যায়, সমর্থক জড়ো করা যায়। যাকে বলা হয় ব্যয় সাশ্রয়ী সংঘবদ্ধকরণ কৌশল। যার মধ্যে পড়ে ডিম ছোড়া, কটূক্তি, অপবাদ দেওয়ার বিষয়গুলো। সমাজে সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রকাশ্য অপমান অনেকটা সামাজিক মৃত্যুর মতো। এমন প্রবণতার কারণে কোনো নেতাকে অপমান শুধু রাজনৈতিক নয়, শেষ অবধি ব্যক্তিগত যুদ্ধ হয়ে ওঠে। কারণ, রাজনীতিবিদরা জানেন মানুষের গায়ে আঘাত না করে আত্মসম্মানে আঘাত করাই বেশি কার্যকর।

দেশে অপমানভিত্তিক রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ভর রাজনীতির মৃত্যু ঘটায়। সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ক্ষয় সাধন করে। ফলে তরুণরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ে। আর তাতেই ক্ষমতার ভাষা ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরুতে হলে অপমানকে খবর হিসেবে না দেখে প্রশ্ন ছুড়তে হবে। নির্বাচনী আচরণবিধিতে অপমানকে শাস্তিযোগ্য করতে হবে। রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু করতে হবে স্কুল।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি