image

দক্ষিণ চট্টগ্রামে ৪টি আসন: বিপাকে দুই দল ও জোট

নিরুপম দাশগুপ্ত ও নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটি আসনে স্বতন্ত্র ও জোট শরিক প্রার্থীদের কারণে বিএনপি ও জামায়াত দুই দল ও তাদের জোট চরম সংকটে পড়েছে। দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা মাঠে থাকায় জোটের ভেতরে অস্থিরতা ও অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

দুই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী,

একটিতে এলডিপি না জামায়াত প্রার্থী তা নিয়ে বিভ্রান্তি

আরেকটিতে জামায়াত ও এনসিপির টানাটানি

দক্ষিণ চট্টগ্রামের দুটি আসনে বিএনপির তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং অন্য দুটি আসনে জামায়াতের শরিক দল এনসিপি ও এলডিপির প্রার্থীদের বিপরীতে জামায়াত প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে থাকায় জোটের শীর্ষ পর্যায়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এসব আসনে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই ঘোষিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছেন। আর, চট্টগ্রাম-১২ আসনে জামায়াতের চাপে এলডিপির প্রার্থী ইয়াকুব আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে এলডিপির নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-বায়েজিদ) আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট

এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেয়া হয়। তবে জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাছের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। ফলে এনসিপির প্রার্থীর বিপক্ষে জামায়াত ইসলামের নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাছের বলেন, জোটের পক্ষ থেকে যাকে প্রার্থী করা হয়েছে তিনি এলাকায় পরিচিত নন। তার স্থায়ী বসবাসও নির্বাচনী এলাকায় নেই এবং অতীতে কোনো রাজনৈতিক কর্মকা-ে তাকে দেখা যায়নি। জামায়াতের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের অনুরোধেই’ তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জোটের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির নেতা ফজলে রাব্বী চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনে কেউ কাউকে ছাড় না দিলে আসনটি উন্মুক্ত রাখাই ভালো। এনসিপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে জামায়াত প্রার্থীর লোকজন যেভাবে গুজব ছড়াচ্ছে, তা অনুচিত।’ কথা ও কাজে মিল না থাকলে মানুষ তাদের ‘মুনাফেক হিসেবে চিহ্নিত করবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনী মাঠে থাকার ঘোষণা দেন এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ।

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপির এম. ইয়াকুব আলী মনোনয়ন পেলেও জামায়াতের প্রার্থী ডা. ফরিদুল আলম মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। জামায়াতের তৃণমূল নেতাকর্মীরা জানান, তারা এলডিপির ছাতা প্রতীকে ভোট না দিয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ফরিদুল আলমের পক্ষে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণা শুরু হয়েছে।

এলডিপির নেতাকর্মীদের দাবি, স্থানীয় জামায়াত নেতাদের চাপে পড়ে ইয়াকুব আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এলডিপির প্রার্থী ইয়াকুব আলীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পটিয়া উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াত নেতা আশেকুল মোস্তফা তাইফু বলেন, ‘পটিয়ায় এলডিপির সাংগঠনিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট দেয়ার মতো লোকবলও তাদের নেই। এ কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছে।’

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও আংশিক সাতকানিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জসিম উদ্দীন আহমেদ মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী এবং ২০০৮ সালের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মিজানুল হক চৌধুরী।

নেতা-কর্মীদের মতে, শফিকুল ইসলাম রাহী গত ১৭ বছর ধরে বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক রয়েছে। আর, মিজানুল হক চৌধুরী ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত ছিলেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম রাহী বলেন, ‘এই এলাকার নারী-পুরুষসহ বিএনপির অধিকাংশ কর্মী-সমর্থক আমার পক্ষে কাজ করছেন। আমি এলাকাবাসীর কাছে পরীক্ষিত মানুষ। আল্লাহ সহায় থাকলে বিজয়ী হব ইনশাল্লাহ।’

বিএনপির দলীয় প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি এম. এ. হাশেম রাজু বলেন, ‘ইতিহাসে কখনো মূলধারার বাইরে গিয়ে কেউ ভালো কিছু করতে পারেনি।’ ‘শেষ পর্যন্ত ধানের শীষেরই বিজয় হবে’ বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। তবে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক লিয়াকত আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

লিয়াকত আলী বলেন, ‘বাঁশখালীর মানুষ পরিবারতন্ত্র চায় না। তারা সৎ ও ঈমানদার মানুষকে ভোট দিতে চায়। বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মী আমার সঙ্গে রয়েছে।’

জামায়াতের আশা বিএনপির বিভক্তি তাদের সুবিধা দিবে। বাঁশখালী উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো. আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘বিএনপির একাধিক প্রার্থী থাকায় জামায়াতের প্রার্থীই বিজয়ী হবে।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াত আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী বলেন, পটিয়া ও বোয়ালখালীতে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তৃণমূলের চাপে দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচনে রয়েছেন। তবে এ নিয়ে জোট শরিকদের সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে না বলে তিনি দাবি করেন।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুদ্দীন সালাম মিঠু বলেন, ‘যেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন সেখানে তারা সুবিধা করতে পারবেন না। সব মান-অভিমান ভুলে নেতাকর্মীরা ধানের শীষেই ভোট দেবেন।’

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি