আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার পর সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সাড়া পড়েছে। বিশেষ করে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের নাম প্রকাশের পর সিলেট জামায়াত ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের ফুরফুরে মেজাজ ও আশাবাদী মনোভাব।
১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে এককভাবে জয়ের রেকর্ড নেই জামায়াতের
এই নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের ১১ জন, বিএনপির ৬ জন, জাতীয় পার্টির ৪ জন, ইসলামী ঐক্যজোটের ১ জন, স্বতন্ত্র ১ জন এবং বিএনপির শরিক হিসেবে জামায়াত ইসলামীর ১ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন
স্থানীয়ভাবে দেখা গেছে, বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণার পর জামায়াত নেতাদের মধ্যে উৎসাহ ও কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। তারা মনে করছেন, দলীয় কোন্দল এবং বিএনপি প্রার্থীদের মাঠপর্যায়ে দুর্বল অবস্থানের কারণে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে। যদিও ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত জামায়াত ইসলামী সিলেটের কোনো আসন থেকে এককভাবে বিজয়ী হতে পারেনি। শুধু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচনে না থাকলে তাদের ভোট কোন দিকে যাবে এ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া এক সময় সিলেট ছিল জাতীয় পার্টির দুর্গ। তাদের ভোটের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বাধিক প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১১ জন, বিএনপির ৬ জন, জাতীয় পার্টির ৪ জন, ইসলামী ঐক্যজোটের ১ জন, স্বতন্ত্র ১ জন এবং বিএনপির শরিক হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন। অর্থাৎ এ চারটি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী এককভাবে বিজয়ী হতে পারেননি।
তবে এবার আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ফুরফুরে মেজাজ থাকলেও ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ইসলামী তৃণমূল পর্যায়ে ভোটে প্রভাব রাখে। মাঠে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বিএনপির দুর্বল প্রার্থীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যে কারণে ফুরফুরে মেজাজে জামায়াত ইসলামী
এক. সিলেট-১ আসন
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান। বিএনপি থেকে প্রার্থী হতে মাঠে ছিলেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। শুরু থেকেই আরিফুল হক আঁচ করতে পেরেছিলেন, তাকে এই আসনে প্রার্থী না-ও করা হতে পারে। সে সময় গুঞ্জন ওঠে, তাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী করা হতে পারে।
এক পর্যায়ে তিনি ওই এলাকার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে পাথর কোয়ারি খুলে দেয়া এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্টোন ক্রাশার মেশিনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। এলাকাটিতে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, উৎমা ও জাফলং পাথর কোয়ারি এখানেই অবস্থিত। ফলে ধারণা করা হচ্ছিল টিকেট পেলে শ্রমিকদের লক্ষাধিক ভোট তার বাক্সে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি এই আসনের টিকেট পান।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের সিটি নির্বাচনে জামায়াত-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রায় ১১ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সিটির আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে সদর উপজেলার ভোটার যুক্ত হয়েছে। ফলে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হকের পূর্ণাঙ্গ সমর্থন ও ঐক্য না থাকলে জামায়াতে ইসলামীর ভাগ্য খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৭,৫১৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। অন্যদিকে ৩৭,০৯০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন বিএনপির বর্তমান প্রার্থীর বাবা খন্দকার আব্দুল মালিক।
দুই. সিলেট-৩ আসন
দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জের একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসনটি জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। প্রথমে এখানে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মাওলানা লোকমান আহমদের নাম শোনা গেলেও পরে আসনটি শরিক দলকে ছেড়ে দেয় জামায়াত ইসলামী।
বিএনপি থেকে প্রার্থী করা হয়েছে দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশে ফেরা যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম. এ. মালিককে। এই আসনে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টি, ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হন। বর্তমানে এখানে বিএনপি ছাড়াও জাতীয় পার্টির আতিকুর রহমান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার মোস্তাকিম রাজা চৌধুরীর অবস্থান শক্ত।
তিন. সিলেট-৬ আসন
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, যিনি দলের ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীদের একজন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন (২০০০-০২)। বর্তমানে তিনি জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির।
এই আসনের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় জামায়াত নেতা হাফিজ নজমুল ইসলাম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বিয়ানীবাজারেও তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। এখানে বিএনপি প্রার্থী করেছে জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরীকে। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ৮২৯০ ভোট, বিপরীতে হাফিজ নজমুল ইসলাম পেয়েছিলেন ২৪৩৬৯ ভোট।
এমরানকে প্রার্থী করার পর বিয়ানীবাজার উপজেলা ও পৌর বিএনপির এক আলোচনাসভায় নেতারা বলেন, ‘আমরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলছি না। দলের দুর্দিনে ২০১৮ সালে ফয়সল আহমদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। তিনি সারাদেশে তৃতীয় হয়ে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। অথচ এখন ‘সুদিনে’ এমন একজনকে প্রার্থী করা হলো, যাকে সাধারণ মানুষ চিনেই না।’
২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের নুরুল ইসলাম নাহিদ ১,৩৮,৩৫৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান পান ৫১,৭৬৪ ভোট। ২০০১ সালে এই আসনে জেলার একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন (লেচু মিয়া) নির্বাচিত হয়েছিলেন।
চার. সিলেট-৪ আসন
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জৈন্তাপুরের দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীন। বিএনপি এখানে প্রার্থী করেছে সিলেট সিটির সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। শুরুতে ‘লোকাল চাই’ স্লোগানে মিছিল হলেও পরে বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম চৌধুরী তাকে সমর্থন দেন। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মো. জয়নাল আবেদীন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন।
পাঁচ. সিলেট-৫ আসন (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ)
এই আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি। তাদের শরিক দল ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি মাওলানা ওবায়দুল হক এখানে প্রার্থী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি ২৬,২৬৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তখন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী ১৫,২০৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। তবে ২০০১ সালে বিএনপির শরিক হয়ে নির্বাচন করে ফরীদ উদ্দিন চৌধুরী বিজয়ী হন এটাই ছিল জামায়াতে ইসলামীর প্রথম সংসদীয় জয়।
এবার আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ, জাতীয় পার্টির নীরবতা এবং বিএনপির দুর্বল প্রার্থী ঘোষণার কারণে জামায়াতে ইসলামী কিছুটা ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে জনগণ।