ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে শিল্পঘন ফতুল্লা অঞ্চল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। আসনটিতে জোটের প্রার্থীর বাইরেও বিএনপির অন্তত তিনজন নেতা ভোটের মাঠে সক্রিয়। আর গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাও রয়েছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ইসলামিক ও সমমনা এগারো দলের প্রার্থী।
রাজধানীর পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। আসনটিতে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোটারদেরও আলাদা নজর। এখানে একাধিক প্রার্থী রয়েছেন যারা এ আসনে আগে জনপ্রতিনিধি ছিলেন। ভোটের মাঠ তাদের পরিচিত।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি বরাবরই নির্বাচনে আলোচনায় থাকে। বিগত সময়ে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের স্থানীয় হেভিওয়েট বা বিভিন্ন কারণে আলোচিতরাই আসনটিতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে চারবার সংসদ সদস্য ছিলেন একেএম শামীম ওসমান। প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের এ সদস্য গত বছরের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে এখন সপরিবারে দেশান্তর। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য অভিযোগে শতাধিক মামলা হয়েছে ।
এক সময় এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন নন্দিত অভিনয়শিল্পী কবরী (সারাহ বেগম)। তিনি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তার আগে বিএনপির দুই হেভিওয়েট আসনটিতে সংসদ সদস্য ছিলেন।
এবারও আসনটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ আসনেই সবচেয়ে বেশি ১৩ জন প্রার্থী রয়েছেন। এ তালিকায় বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী ছাড়াও আছেন বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আলী, স্বতন্ত্র মো. শাহ্ আলম ও মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, জাতীয় নাগরিক পার্টির অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন, সিপিবির ইকবাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি ইসমাইল কাউসার, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সেলিম মাহমুদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আনোয়ার হোসেন, খেলাফত মজলিসের ইলিয়াস আহমেদ, গণঅধিকার পরিষদের আরিফ ভূঁইয়া, বাংলাদেশ সুপ্রীম পার্টির সেলিম আহমেদ, জাতীয় পার্টির সালাউদ্দিন খোকা মোল্লা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. সুলাইমান দেওয়ান।
তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী ও গিয়াস উদ্দিন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। গিয়াস উদ্দিনকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তিনি নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ছিলেন।
ভোটের মাঠে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন পাঁচ নেতা। তারা হলেনÑ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মনির হোসাইন কাসেমী, বিএনপির সাবেক দুই সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ও গিয়াসউদ্দিন, সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা মো. শাহ আলম ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন।
গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই আত্মগোপনে, কেউ জেলে। অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার অভিযোগে ডজনেরও অধিক মামলা। ফলে, এবার জনসমর্থনের দৌড়ে বিএনপি অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি তাদের কোনো প্রার্থী দেয়নি। তারা জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে আসনটি ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে বিএনপি-জোটের প্রার্থী জমিয়তের মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অধীনেই অংশ নিয়েছিল বিএনপি। ওই নির্বাচনেও আসনটি জোটের শরিক দলের জন্য ছেড়ে দেয় বিএনপি। সে সময়ও মনির হোসাইন কাসেমী ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু এবার জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব কাসেমী নিজ দলের প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করছেন। ইতোমধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে নিজের দিকে ভিড়য়েছেন মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। এর প্রতিফলন দেখা যায় তার নির্বাচনী প্রাচরণায় ফতুল্লা বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতি।
কাসেমী তার দল জমিয়তের জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি হেফাজতে ইসলামেরও নেতৃত্বে আছেন। সংগঠনটির জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বেও আছেন তিনি। ইসলামী ঘরানায় তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। ফলে এবার তার অবস্থান গতবারের তুলনায় বেশ শক্ত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে, আসনটিতে তাকে বিএনপিরই তিনজন সাবেক নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতার সামনে পড়তে হচ্ছে। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন অন্যতম। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে কয়েকদিন আগে বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
কিন্তু গিয়াস উদ্দিন এখনও ভোটের মাঠে আছেন। এ অঞ্চলে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে। কেননা, তিনি ২০০১ সালে আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও এক সময় তিনি কৃষক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে তার অনুসারী বিএনপির বড় এক কর্মী বাহিনী রয়েছে। ফলে তিনি এ আসনে বড় ফ্যাক্টর।
মাঠ ছাড়েননি বিএনপির সদ্য সাবেক আরও দুইজন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. শাহ্ আলম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকেও দল বহিষ্কার করেছে। শাহ্ আলমও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। এর আগে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
পেশায় ব্যবসায়ী শাহ আলমের ফতুল্লা অঞ্চলে বেশ প্রভাব রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকেই তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন দীর্ঘকাল। ফলে তাদের একটি বড় অংশ কাজ করছে শাহ আলমের পক্ষে। তার পারিবারিক পরিচিতিও রয়েছে। বাবা হাজী উদ্দিনও ছিলেন বিএনপির সংসদ সদস্য।
আসনটিতে ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা দিয়েছেন আরেক সদ্য সাবেক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী। ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির ওই নির্বাচনের পর বিএনপির সরকার বেশিদিন না টিকলেও অল্প সময়ের জন্য হলেও সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন আলী। নারায়ণগঞ্জে রাজনীতির অঙ্গনে মোহাম্মদ আলীর নাম অনেকেই ‘সমীহের সঙ্গে’ উচ্চারণ করেন। তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডেরও আহ্বায়ক।
তরুণদের চেয়ে প্রবীণ রাজনীতিক, কর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। যদিও তার বিরুদ্ধে আলোচিত-সমালোচিত প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে।
সাবেক বিএনপি ও জোটের এই চার প্রার্থীর পাশাপাশি আলোচনায় আছেন আব্দুল্লাহ আল আমিনও।
কেননা তিনি গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এনসিপির প্রার্থী। তিনিও তরুণ, পেশায় আইনজীবী। আছেন দলটির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব পদে আর নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয় কমিটিরও প্রধান। দলের শৃঙ্খলা কমিটির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশ।
আব্দুল্লাহ আল আমিন জামায়াতের নির্বাচনী জোট ১১ দলের প্রার্থী । তাকে আসনটি ছেড়ে দিতে জামায়াত তাদের প্রার্থী মাওলানা আবদুল জব্বারকে সরিয়ে নিয়েছে। এখন তিনি নিয়মিত আব্দুল্লাহ আল আমিনের নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করছেন। যদিও মাওলানা জব্বারই ছিলেন নারায়ণগঞ্জের বাকি চারটি আসনের চেয়ে জামায়াতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী। তবে আব্দুল্লাহ আমিন নিজেও এক সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে তরুণদের একাংশের সাড়ার পাশাপাশি জামায়াতের সমর্থনও পাবেন তিনি।