‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ১০টি দফায় গুরুত্ব দিয়ে সরকার পরিচালনায় ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার, (০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) সন্ধ্যায় ঢাকার বনানীতে হোটেল শেরাটনে এ ইশতেহার তুলে ধরেন দলের আমির শফিকুর রহমান।
এ ইশতেহার ‘জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব, শৃঙ্খলাবান্ধব’: দলের আমির শফিকুর রহমান
এনসিপি, এবি পার্টিসহ ১১ দলের জোট গড়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলের ইশতেহারকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, শান্তিবান্ধব ও শৃঙ্খলাবান্ধব বলে দাবি করেন তিনি। ভোটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় জামায়াত কী করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয় ইশতেহারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়রি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনে অংশ নিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও ইসলামভিত্তিক কয়েকটি দলকে নিয়ে ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে জামায়াত। ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবন্দ, অতিথিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী নেতা, কূটনীতিক, জামায়াতের পেশাজীবী সমর্থকদের মধ্যে শিক্ষক, আইনজীবী ও চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
ইশতেহার ঘোষণার আগে ও পরে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনায় জামায়াতের অঙ্গীকার তুলে ধরে অনুষ্ঠানে দুটি ভিডিও উপস্থাপনা দেয়া হয়। এতে নির্বাচনে জয়ী হলে দলটির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকারসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়।
ইশতেহারে আট ভাগ
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারের নাম দেয়া হয়েছে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’। ‘দেশের বাস্তবতা, জনগণের চাহিদা ও আগামীর সম্ভাবনাকে’ সামনে রেখে ইশতেহারকে আটটি ভাগে ভাগ করেছে।
এর মধ্যে জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ; আত্মনির্ভরতার পথে নিজ পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়; টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি; স্বনির্ভর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন; মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন; সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন; যুবকদের নেতৃত্বে প্রযুক্তি বিপ্লব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ; সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে।
‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি ‘না’ রয়েছে। হ্যাঁ-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। না-এর মধ্যে আছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।
‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিসহ ইনসাফ ও ন্যায়ভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও যুবকের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।
আমি আহত পাখি
ইশতেহার ঘোষণার সময় জামায়াতের আমির তার ‘এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক’ হওয়া; অতঃপর ‘নারী বিদ্বেষী’ একটি পোস্টকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি আহত পাখির মতো এখন। আমার ওপর যেভাবে কয়েকদিন মিসাইল চলছে। আমি অ্যান্টি মিসাইল ব্যবহার করি নাই। যারা এটা করেছে আমি তাদের মাফ করে দিয়েছি। আমি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না।’
সবাইকে ক্ষমা করে দেয়ার কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান, ‘আমার রক্ত ও মেজাজের সঙ্গে প্রতিশোধ যায় না। ভুলের জন্য আমি যদি ক্ষমা করতে না পারি, ক্ষমা চাইতে না পারি তাহলে আমার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইব কীভাবে? আমি প্রতিশোধের পথে হাঁটতে চাই না। তাহলে আমার ওপর আরেকজনের প্রতিশোধ নেয়া প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।’
*চারিদিকে হাহাকার*
নির্বাচনের আগে ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তি নাই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘চারিদিকে হাহাকার চলছে।’ আগের সরকারের সময়কার লুটপাট ও অর্থপাচারের সমালোচনা করে তিনি দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেন। তার দল জামায়াত সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে ‘সবার জন্য ন্যায় ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে’ পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
ইশতেহার প্রণয়নে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পেশার ২৫০-এর বেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয় তৈরি করা জনগণের মতামতকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। দলের আমির বলেন, ‘আমাদের দলের ইশতেহার তৈরিতে লাখ লাখ মানুষ মত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকরা সহযোগিতা করেছেন।’ জামায়াত ক্ষমতায় এলে কী কী পরিবর্তন ঘটবে তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি নির্বাচনে আমি জামায়াতের বিজয় চাই না, আমি চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।’
তিনি বলেন, ‘বেকার ভাতা নয়, বরং আমরা তোমাদের হাতে কাজ তুলে দেব। আমাদের এখানে চা বাগান থেকে উঠে আসা তরুণও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, আমরা এমনভাবে গড়তে চাই।’ নারীদের কর্মঘণ্টা ও অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি। প্রবাসীদের মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে বলি, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। কিন্তু ৫৪ বছরে সেই স্লোগানের স্বাক্ষর দিতে পেরেছি? এই বৈষম্য ৫৪ বছর আগেও ছিল। ‘৪৭ থেকে জাতির স্বাধীনতার সূচনা, এরপর বঞ্চনার শিকার হয়ে ’৭১। তারপর দফায় দফায় গণঅভ্যুত্থান। শেষপর্যন্ত এসে ঠেকেছে চব্বিশে। ‘২৪-এ খুব সামান্য দাবি ছিল।’
তিনি বলেন, ‘৪৭ না হলে ৭১ হতো না, ৭১ না হলে ২৪ পেতাম না। একটি অন্যটির সাথে সম্পর্কিত।’ ইশতেহারকে ‘জাতির প্রতি জীবন্ত দলিল’ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইশতেহার কেবল দলীয় কর্মসূচি না, বরং জাতির প্রতি দলের পরিকল্পপনা; এটি একটি জীবন্ত দলিল।’
* যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার *
নির্বাচনী ইশতেহারে জামায়াত যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেছে, সেগুলো হলো-
‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রাধান্য দেয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ; সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন; প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন; প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি; সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সবধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব?্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা; জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা; ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যরে শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া; ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি; শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ, বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা; প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণী-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা; আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা; দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা; নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা; ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা; সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকদের আন্তর্জাতিকমানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এবং সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
সারাদেশ: দুপচাঁচিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত