ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং যে কোনো মূল্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
মেধার মূল্যায়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ
১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে না পারার বিধান চালু করে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘খাল খনন’ কর্মসূচিকে বড় আকারে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা
একইসঙ্গে পরিবেশ রক্ষায় দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে দলটি।
রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুক্রবার, (০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬), (০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) দলের এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও সিনিয়র সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি ৫১ দফার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যার মধ্যে ৯টি বিষয়কে প্রধান প্রতিশ্রুতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণাকালে তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনার সাফল্যের পূর্বশর্ত হলো আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাকে যে কোনো মূল্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এই তিনটি বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে কোনো পরিকল্পনাই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে দুর্নীতি দমনে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করবেন এবং দুদককে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবেন। বিগত সরকারের সময়কার দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি ঘটেছিল, যা পরবর্তী সময়ে আবারও অবনতির দিকে যায়।
তারেক রহমান বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই বিএনপি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য খালেদা জিয়ার সরকার তৎকালীন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে সরকারের হস্তক্ষেপমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা হিসেবে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ গঠন করে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিএনপি সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে প্রথম বছর থেকেই দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ অগ্রগতি লাভ করতে শুরু করে।
দেশকে এগিয়ে নিতে মেধার সঠিক মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। ইশতেহারের ৫ নম্বর প্রতিশ্রুতিতে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না এমন বিধান চালু করে ক্ষমতার ভারসাম্য ও নতুন নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিএনপি তাদের ইশতেহারে ‘খাল খনন’ কর্মসূচিকে বড় আকারে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে। ইশতেহারের ৭ নম্বর দফায় বলা হয়েছে, দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ৫০ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।
ইশতেহারে প্রান্তিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে পরিবার প্রতি ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য দেওয়া হবে। কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, স্বাস্থ্যখাতে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রাথমিক শিক্ষায় ‘মিড-ডে মিল’ চালুর অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয় বরং এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়বে যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুম্মন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ।
উল্লেখ পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের চেয়ারপারসন মরহুম খালেদা জিয়া। আর ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি।