৮টিতেই বিএনপির বিদ্রোহী
ময়মনসিংহে বিএনপি, জামায়াত সমর্থিত ১১ দল আর স্বতন্ত্র প্রার্থীর পদচারণায় মুখর ভোটের মাঠ। সিটি করপোরেশন ও ১৩ টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৬৮ জন প্রার্থী। স্বতন্ত্রসহ বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি, বিএনপির (বিদ্রোহী) স্বতন্ত্র ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা।
স্বাধীনতার পর থেকেই ময়মনসিংহ জেলার সংসদীয় ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের আধিপত্য ছিল। প্রতিটি নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের ‘দুর্গ’ খ্যাত ময়মনসিংহ জেলায় গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের একক শাসনামলে জাতীয় পার্টি ভোটের রাজনীতিতে মাঠে থাকলেও দাঁড়াতে পারেনি বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো।
চব্বিশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এ জেলায় বিএনপি নতুন করে যেমন নিজেদের আধিপত্য প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে, তেমনি নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মরিয়া জামায়াতসহ অন্য দলগুলোও। এ ক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটের হিসাবটিও ধরা হচ্ছে জয়-পরাজয়ের সমীকরণে।
১১ আসনেই প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী লড়াই জমে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতীকের মিছিল, পথসভা, উঠান বৈঠক ও জনসভায় সরগরম হয়ে উঠেছে পথ-ঘাট, অলিগলি। প্রার্থী ও তাদের তোকর্মীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার কথা শুনছেন। চায়ের দোকানগুলোতেও সাধারণ মানুষের প্রধান আলোচনার বিষয় ভোট। আগামী সংসদ নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় যাবে, ময়মনসিংহের আসনগুলোর মধ্যে কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, কে সংসদে গেলে এই জেলাটির মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বলবে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া): সীমান্তবর্তী এলাকা গারো পাহাড়ের পাদদেশে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-১ আসন। এ আসনে ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একবার জাতীয় পার্টি বিজয়ী হলেও বাকি নয়বারের মধ্যে সাতবারই আওয়ামী লীগ ও দুইবার বিএনপি নির্বাচিত হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হক সায়েম এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আলোচিত এ আসনে এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রথম বারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। এখানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক সালমান ওমর রুবেল।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আসনটিতে সাতজন প্রার্থী হলেও ভোটের আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। দলীয় কোন্দল সাথে নিয়েই এ আসনে বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারনা। এ ছাড়া দশ দলীয় জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মো. তাজুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলনের মো. জিল্লুর রহমান, কমিউনিস্ট পাটির আজহারুল ইসলাম, লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক ও সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মো. আ. রাজ্জাক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ।
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা): আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদারের বিপরীতে মাঠে আছেন আসনটির সাবেক এমপি বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা শাহ শহীদ সারোয়ার। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদারের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করা বিএনপির সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার। তবে তিনি ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে দল থেকে বহিষ্কার হন। এবার লড়ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে। এ আসেন তার পিতাও কয়েকবারের এমপি ছিলেন। ফলে তার পারিবারিক অবস্থানও দৃঢ় বলে স্থানীরা জানিয়েছেন। এছাড়া এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদুল্লাহর রিকশা, ইসলামী আন্দোলন মনোনীত গোলাম মাওলা ভূঁইয়া হাতপাখা প্রতীক, জাতীয় পার্টির প্রার্থী এমদাদুল হক খান লড়বেন লাঙল প্রতীক নিয়ে।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর): জমিদারি স্থাপথ্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী এম ইকবাল হোসেইন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সদ্য সাবেক আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহম্মদ তায়েবুর রহমান হিরন। তিনি লড়বেন ঘোড়া প্রতীক নিয়ে। এছাড়া এই আসনে দশ দলীয় জোটের বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের প্রার্থী মাওলানা আবু তাহের খান লড়বেন বই প্রতীক নিয়ে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) কাঁচি প্রতীক নিয়ে লড়বেন এ কে এম আরিফুল হাসান।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহম্মেদ তায়েবুর রহমান হিরনের অনুসারীরা মনে করেন, তৃণমূলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণের প্রথম পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও মনোনয়ন বাছাইয়ের ব্যাপারে স্থানীয় ভোট ব্যাংক এবং দলের অসময়ে দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রতীক বরাদ্দের আগে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদল নেতার মৃত্যুর পর এই বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করতে হিরনসহ পাঁচজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও নির্বাচনী মাঠ ছাড়েনি হিরন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরণ এখন ধানের শীষের কাঁটা হয়ে মাঠে আছেন।
ময়মনসিংহ-৪ (সদর) : ময়মনসিংহ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন। বিভাগীয় সদর হিসেবে এ আসনটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিএনপি জামায়াতসহ ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। এ আসনটিতে কোন বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রিয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান এমরান, জাতীয় পার্টির মুসা সরকার, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির এমদাদুল হক মিল্লাত, গণসংহতির মোস্তাফিজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. লিয়াকত আলী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি এনপিপির হামিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) শেখর কুমার রায়। তবে বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রচার প্রচরণায় বেশি এগিয়ে আছে। তবে এখানে গত নির্বাচনগুলোতে বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক রয়েছে এ আসনটিতে। জয়ের জন্যে আওয়ামী লীগের ভোটেরই প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা): বিখ্যাত মিষ্টি জমিদারদের প্রিয় মুক্তাগাছার মন্ডার পরিচিতি রয়েছে দেশজুড়ে। এখানে কোনো বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। সে হিসেবে বিএনপির প্রার্থী বেশ ফুরফুরে মেজাজেই রয়েছেন। বিএনপি উত্তর জেলার আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলু এ আসনে দলীয় প্রার্থী। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রার্থী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের মোহাম্মদ নজরুল সইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর মতিউর রহমান আকন্দ ও এবি পার্টির রফিকুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এ আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রচারণায় এগিয়ে আছে। তবে শক্ত অবস্থানে বিএনপি রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া): লাল চিনি ও কাঁচা হলুদে সমৃদ্ধ আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেই রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। বিএনপি প্রার্থী আখতারুল আলমের বিপরীতে মাঠে রয়েছে বিএনপির সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামছ উদ্দিনের স্ত্রী বিএনপির প্রার্থীর চাচি আখতার সুলতানা। আর জামায়াত প্রার্থী কামরুল হাসানকে ঠেকাতে মাঠে রয়েছে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিন।স্থানীয় রাজনীতিকরা মনে করছেন, আখতার সুলতানা সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামছ উদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী হওয়ায় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে ধানের শীষের প্রার্থীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তারই চাচি স্বতন্ত্র প্রার্থী আখতার সুলতানা। দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে একই আদর্শের ও একই পরিবারের এই স্বতন্ত্র অবস্থান ভোটের সমীকরণে বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে ব্যতিক্রম এই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলেরই আরেক প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। দল থেকে জেলা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলনকে প্রার্থী ঘোষণা করায় ক্ষুব্ধ হন সাবেক প্রার্থী জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের অনুসারীরা। তারা দলীয় প্রার্থীকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে মিছিলও করেছেন। দলীয় পদ স্থগিত হওয়া সত্ত্বেও জসিম উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জোড়েসুড়েই মাঠে রয়েছেন। তবে জামায়াত ও বিএনপি দুই বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে থাকায় ফুলবাড়িয়ায় ভোটের সমীনরণ জটিল হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল): জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশাল আসনেও বিএনপির বিপরীতে রয়েছে বিদ্রোহী। এখানে বিএনপির প্রার্থী ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী এখানকার সাবেক এমপি আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে আনোয়ার সাদাত। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন ধানের শীষ প্রতীক পেলেও তা উপজেলা বিএনপির একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।তাই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদত কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আছাদুজ্জামান সোহেলও বেশ ভালোভাবেই মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ): এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসমলাসীর ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীসহ ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির প্রার্থী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ফখরুল ইমাম, ১১ দলীয় জোটের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপির মো. আওরঙ্গজেব বেলাল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বিএনপির সাবেক এমপি শাহ নুরুল কবির শাহিন। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী বেশ জোরেসোরে প্রচারণা চালালেও সাবেক এমপি হিসেবে শাহ নুরুল কবির শাহিন ভোটারদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে আছেন। তিনি বিএনপি থেকে মনোননয়ন চেয়ে না পেয়ে এলডিপিতে যোগ দিয়ে মনোননয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়ে মাঠে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে সাড়া ফেলেফেন।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল): এ আসনে বিএনপি পারিবারিক লড়াই চলছে। শেষ পর্যন্ত এই পারিবারিক লড়াই কোথায় গিয়ে গড়ায় তার জন্যে ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এখানে নির্বাচনী ময়দানে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সবটুকু মনোযোগ এখন বিএনপির পারিবারিক লড়াইয়ের দিকে। এখানে ধানের শীষে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খান চৌধুরীর ছেলে ইয়াসের খান চৌধুরীর তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন তাঁরই আপন চাচি সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত বিএনপির নেতা খুররম খান চৌধুরীর সহধর্মিণী স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিনা খান চৌধুরী। ফলে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ খোদ বিএনপিরই শক্তিশালী বিদ্রোহী অংশ। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বাবা প্রয়াত আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী ১৯৯১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর পরিচ্ছন্ন ইমেজের একটি বড় প্রভাব এলাকায় আজও বিদ্যমান। বাবার জনপ্রিয়তা ও দলীয় প্রতীককে পুঁজি করে ইয়াসের খান জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও তাঁর সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন তাঁর চাচি হাসিনা খান চৌধুরী।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিনা খান চৌধুরী নান্দাইলের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত খুররম খান চৌধুরীর সহধর্মিণী। খুররম খান চৌধুরী ছিলেন ইয়াসের খানের বাবা আনোয়ারুল হোসেন খানের ছোট ভাই। সাবেক সংসদ সদস্য থাকা খুররম খান চৌধুরীর রয়েছে বিশাল ব্যক্তিগত ভোট ব্যাংক। তাঁর মৃত্যুর পর তার অনুসারী হিসেবে তার ছেলে নাসের খান চৌধুরী ও স্ত্রী হাসনিা খান চৌধুরী বিএনপি থেকে মনোনয় চেযয় পাননি। পরে নেতা-কর্মীরা এখন জোটবদ্ধ হয়ে হাসিনা খান চৌধুরীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রার্থী করেন। পরে তিনি ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ভোটের ফলাফল কোনদিকে তা জটিল সমীকরণ। কারণ বিএনপির পারিবারিক টানাপোড়েনে এ আসনে ১১ দলের শক্ত প্রার্থী বিডিপির আনোয়ার হোসেন চান ভোটের মাঠে শক্তিশালী অবস্থান গড়েছেন।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও): নানা কারণেই আলোচিত সমালোচিত ময়মনসিংহের গফরগাঁও আসনটিতে বিএনপির তরুণ প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর বিপরীতে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী প্রবীণ নেতা আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান। রাজনীতির রক্তাক্ত জনপদ হিসাবে পরিচিত গফরগাঁও আসনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার দল ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, খোদ দলীয় প্রার্থীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিএনপিরই বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী। দলের মূল ধারার নেতাকর্মীদের সমর্থন না থাকা ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নিয়ে বিতর্কের জেরে গফরগাঁও বিএনপিতে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
বিগত ১২টি নির্বাচনের মধ্যে ৮ বারই এই আসনে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি ২ বার নির্বাচিত হলেও বিএনপি এ আসনটি পেয়েছে মাত্র ১ বার (১৯৯৬ এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে)। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় বিএনপির সামনে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও দলীয় মনোনয়ন পাওয়া আখতারুজ্জামান বাচ্চুর জন্যে দলীয় কোন্দলের কারণে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া এলডিপির মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ মাহমুদ মোর্শেদ ছাতা প্রতীকে লড়বেন। জোটগতভাবে উন্মুক্ত থাকায় জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ইসমাঈলসহ মোট ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা): শিল্পাঞ্চলখ্যাত এ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে হরিণ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) মোর্শেদ আলম। বিএনপি ও বিএনপির বিদ্রোহী দুজনেই অর্থনৈতিকভাবে সবল প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত। তাছাড়া শিল্পাঞ্চল হওয়ায় রাজনীতির মাঠে এ আসনটির গুরুত্বও রয়েছে ব্যাপক। এসব সমীকরণ বিবেচনায় বিএনপির জন্য এ আসনটি তারেক রহমানকে উপহার দেয়া কষ্টকর হয়ে যাবে। এছাড়াও ভালুকায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির শাপলা কলি প্রতীকে ডা.জাহিদুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. মোস্তফা কামালসহ ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ময়মনসিংহের ১১টি আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৪৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের ২৪ লাখ ৬ হাজার ৮৯২ জন এবং নারী ভোটার ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৬৬ জন। নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতি হিসেবে জেলায় মোট ১ হাজার ৩৬৫টি ভোটকেন্দ্র ও ৮ হাজার ৬৯৩টি স্থায়ী ও অস্থায়ী ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার পোস্টাল ব্যালট ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা।