এক্সক্লেইমার
নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয় মানে শুধু বিরোধীপক্ষের দুর্বলতা নয়। বরং এর পেছনে থাকে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা স্রোত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপির বিজয়ও তেমনি রাজনীতির নানা স্তরের ফল।এসব স্তর নিয়ে আলোচনার গভীরে গেলেই অনেকটা স্পষ্ট হয় বিজয়ের কারণগুলো।
তাত্ত্বিকভাবে দেখা গেছে, বিএনপির বিজয়ের পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শাসনবিরোধী মনোভাব। মূলত, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ টানা বহু বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার সময় নানা সংকট দেখা গিয়েছিল। যেমন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল, রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল আর প্রশাসনের দলীয়করণের ধারণা তৈরি করেছিল। এসব কারণ, ভোটারদের একাংশকে সরকার পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেক ভোটার আওয়ামী লীগকে জবাব দিতেই ‘শাস্তিমূলক ভোট’ দিয়েছেন বিএনপিকে।
রাজনীতি অনেক সময় ‘মানিব্যাগ’ বা ‘পকেটের’ স্বাস্থ্য দিয়ে বোঝা যায়। আওয়ামী লীগের সময় থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।ভোটের সময় এলে তখন মানুষ বড় আদর্শের চেয়ে নিজের দৈনন্দিন বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।অর্থনৈতিক অসন্তোষ সরকার বা রেজিম পরিবর্তনের পক্ষে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিরোধী শক্তির একত্রীকরণও ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কৌশলগতভাবে বিএনপি এবার জোট রাজনীতি ও আসন সমঝোতা করেছে। ফলে বিরোধী ভোট আগের মতো আর কাটাকাটি হয়নি।যেখানে একাধিক বিরোধী প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগ হয়ে যায়, সেখানে একক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ায়। বিএনপির এটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দলের পুনরুজ্জীবন ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা ইতিবাচক ফলাফল দিতে পারে। দীর্ঘ সময় চাপে থাকার পরও বিএনপি তাদের তৃণমূল সংগঠন ধরে রেখেছে। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে সক্রিয় প্রচার, ভোটারদের ঘরে ঘরে যোগাযোগ, ডিজিটাল প্রচারণা, সব মিলিয়ে মাঠে উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। শুধু প্রতিবাদী দল হিসেবে নয়, বরং ‘সরকারের বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছে বিএনপি।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফিরে আসা, তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ, সবকিছু মিলে একটা বড় সমর্থন-সহানুভূমি গিয়ে পড়েছে দল ও নেতৃত্বের ওপর।যা এক ভিন্ন আবেগ তৈরি করেছে।দীর্ঘ সময় নির্বাসিত নেতৃত্বের ফিরে আসার ঘটনা সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উচ্ছ্বাস তৈরি করে। যা রাজনীতিতে খুব শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। অনেক সময় যুক্তির চেয়ে তা আবেগকে সক্রিয় করে। বিএনপির ক্ষেত্রে এটা খুব কাজ করেছে।
তরুণ ভোটার ও নতুন প্রজন্মের সমর্থন বড় পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করেছে। প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া তরুণদের বড় অংশ পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। তবে যে সবাই বিএনপির পক্ষে ভোট দিয়েছে, ঠিক এমনটাও নয়। ক্ষমতার রদবদল চাওয়ার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে প্রবল ছিল। যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা ও ন্যারেটিভ তৈরিতেও তারা ভূমিকা রেখেছে। যার সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।
এবারের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ছিল। বিশ্বগণমাধ্যমের নজর, কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণ- এসব ভোটের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটারদের একাংশ মনে করেছেন, এবার পরিবর্তন সম্ভব। ফলাফলও প্রতিফলিত হবে। বিএনপির বিজয়ের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাব ফেলেছে।তাছাড়া অনেক সময় ভোটাররা মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনই মোড় ঘোরানোর শেষ সুযোগ। এই মনস্তত্ত্ব তৈরি হলে ভোটের হার বাড়ে। পরিবর্তনের পক্ষে জনমত তৈরি হয়।এবার সেই জনমতের স্রোত বিএনপির দিকে গেছে বলে মনা করা যেতে পারে।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
নির্বাচনে বিএনপির বিজয়কে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনার ফল হিসেবে দেখলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানভিত্তিক কয়েকটি তাত্ত্বিক মডেলে বিজয়কে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
দীর্ঘ শাসনের ক্লান্তি বা শাসন-অবসাদ তত্ত্ব অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় একদলীয় বা একটানা শাসনব্যবস্থা চললে ভোটারদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এটি আদর্শগত বিরোধিতার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত প্রতিক্রিয়া। আওয়ামী লীগ টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার আর নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে বিতর্ক জমে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ভোটারদের একটি অংশ ‘ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা’কে গণতান্ত্রিক প্রয়োজন হিসেবে দেখতে শুরু করে। শাসন-অবসাদ তত্ত্ব বলছে, পরিবর্তন এখানে শুধু নীতিগত নয়, বরং চক্রাকার গণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া।
শাস্তিমূলক ভোটের রাজনীতি তত্ত্বে বলা হয়েছে, ভোটাররা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো দলকে সমর্থন করার চেয়ে বিদ্যমান সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেই ভোট দেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবিকা সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ধারণা- এসব বিষয় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করলে তারা বিরোধী শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন। এখানে বিরোধী দল নিখুঁত বিকল্প কিনা তা মুখ্য নয়; মুখ্য হলো বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিরোধ। বিএনপির পক্ষে ভোটের একটি অংশকে ‘শাস্তিমূলক ফল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অতীত পারফরম্যান্সের বিচার তত্ত্ব বলছে, ভোটাররা ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির চেয়ে অতীত শাসনের পারফরম্যান্সকে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেন। অর্থাৎ প্রশ্ন আসে, ‘গত মেয়াদে সরকার কেমন করেছে?’অর্থনৈতিক সূচক, আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, নাগরিক স্বাধীনতা- এসব বিষয়ের ওপর ভোটারদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার মনে করে থাকেন যে তাদের জীবনমান প্রত্যাশা মতো উন্নত হয়নি, তবে তারা বিকল্প নেতৃত্বকে সুযোগ দিতে পারেন। এই ব্যাখ্যায় বিএনপির বিজয় হলো পারফরম্যান্সভিত্তিক পুনর্মূল্যায়নের ফল।
ভোটের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বিশেষ নির্বাচন কখনও কখনও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা করে। এতে ভোটার জোট, আঞ্চলিক সমর্থনভিত্তি আর সামাজিক শ্রেণিভিত্তিক ভোটের ধারা পরিবর্তিত হয়।যদি দেখা যায় যে তরুণ ভোটার, শহুরে মধ্যবিত্ত, অথবা নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক ভোটাররা আগের তুলনায় ভিন্নভাবে ভোট দিয়েছেন, তবে তা আংশিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই নির্বাচন বিএনপির জন্য কেবল ক্ষমতায় ফেরা নয়; বরং সামাজিক জোট পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে, যদি তারা এই সমর্থন ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
বিরোধী ভোটের একীকরণ তত্ত্ব অনুযায়ী, অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী ভোট বিভক্ত থাকলে ক্ষমতাসীন দল সুবিধা পায়। কিন্তু বিরোধী শক্তিগুলো যদি কৌশলগত সমঝোতায় আসে, তবে ‘ভোট কেন্দ্রীভবন প্রভাব’ তৈরি হয়।বিএনপির জোট কৌশল ও আসন সমন্বয় বিরোধী ভোটকে একত্রিত করেছে, এমন বিশ্লেষণ করা যায়। এটি কাঠামোগত সুবিধা দিয়েছে। যা তাত্ত্বিকভাবে ডুভারজের সূত্র বা দ্বিদলীয় প্রবণতার সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিজয়ের সম্ভাবনা বাড়ায়।
শেষে বলা যায়, যদি নতুন সরকার কার্যকর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্গঠনে রূপ নিতে পারে। অন্যথায়, ইতিহাসের চক্র আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
অর্থ-বাণিজ্য: ওয়ালটন ই-বাইকে আকর্ষণীয় মূল্যছাড়
অর্থ-বাণিজ্য: দেশের ভেতরে নগদ অর্থ বহনে কোনো সীমা নেই: বাংলাদেশ ব্যাংক
অর্থ-বাণিজ্য: বিকাশ, নগদ, রকেটে টাকা পাঠাতে আর বাধা নেই