বিশ্লেষণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আবারও সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি অতীতে দুই দফা দেশ শাসন করেছে। তবে তাদের আগের শাসনামল, বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ সময়কাল— আইনশৃঙ্খলা, জোট রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এর প্রতিক্রিয়ায় ভূমিধস জয় পায় আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে, গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসন নিয়েও গণতন্ত্র, নির্বাচনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবারের সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে থাকছে বাংলাদেশ জামায়ীতে ইসলামী, অর্ধশতাধিক আসন নিয়ে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও আসছেন। যারা জবাবদিহিতার প্রশ্নে সরব হতে পারেন। এই বাস্তবতায় সরকার গঠন শুধু রাজনৈতিক বিজয় নয়, বরং এক জটিল দায়িত্ব। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে যে বড় চ্যালেঞ্জগুলো থাকতে পারে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বৈদেশিক চাপ
বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, বৈদেশিক ঋণপরিশোধের চাপ ও ডলারের অস্থিরতার মুখে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণ, কর সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন- এসব দ্রুত সিদ্ধান্ত দাবি করবে।সরকারকে একই সঙ্গে জনপ্রিয়তা রক্ষা ও কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হবে। ভুল পদক্ষেপ হলে সামাজিক অসন্তোষ বাড়তে পারে।
ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র- তিন পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য ইস্যু, চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও ঋণ, যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে অবস্থান, একপক্ষের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকলে অন্যপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা হবে বড় পরীক্ষা।
সংসদে শক্ত বিরোধীদল ও তরুণ কণ্ঠ
জামায়াত উল্লেখযোগ্য আসন নিয়ে সংসদে থাকবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কিছু তুখোড় বক্তা ও রাজনৈতিক কর্মী এবার সংসদে আসছেন।এই পরিস্থিতিতে সংসদ হবে আরও বিতর্কপূর্ণ। আইন পাস, বাজেট অনুমোদন, নীতিগত সিদ্ধান্ত- সব ক্ষেত্রেই জোরালো প্রশ্ন ও পাল্টা-প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে সরকারকে।দমনমূলক কৌশল নিলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে; আবার অতিরিক্ত শিথিলতা দিলে নীতিগত অচলাবস্থাও দেখা দিতে পারে।
সংস্কার ও গণতান্ত্রিক আস্থা পুনর্গঠন
দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিএনপি যদি সত্যিই ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’- এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তাকে- নির্বাচনব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব কমানো- এসব বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় রূপ নিতে পারে।
অতীতের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন
২০০১–২০০৬ সময়কালের সহিংসতা, জোট-রাজনীতির জটিলতা ও উগ্রবাদ মোকাবিলার বিতর্ক এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসে। সরকার গঠনের পর বিএনপিকে দেখাতে হবে, তারা কি আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে? তারা কি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল শাসন কাঠামো গড়তে পারবে? বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠনই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি।
সামাজিক মেরুকরণ ও নাগরিক স্বাধীনতা
দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা-এসব বিষয়ে বিশ্বদৃষ্টি থাকবে তীক্ষ্ণ।যদি সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা না দেয়, তবে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে।
জলবায়ু ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির শীর্ষ দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় সুরক্ষা, নদীভাঙন, নগরায়ণ, খাদ্য নিরাপত্তা—এসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দাবি করে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হতে পারে।
ক্ষমতায় ফেরা রাজনৈতিকভাবে বড় অর্জন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা একই সঙ্গে এক কঠিন পরীক্ষা।অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য, সংসদীয় জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার- সবকিছু মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য সময়টি হবে সিদ্ধান্তমূলক। বিজয় উদ্যাপন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, কীভাবে তারা আস্থা, স্থিতিশীলতা ও কার্যকর শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। রাজনীতি এখন শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি বিশ্বাসের লড়াইও।
অর্থ-বাণিজ্য: ওয়ালটন ই-বাইকে আকর্ষণীয় মূল্যছাড়
অর্থ-বাণিজ্য: দেশের ভেতরে নগদ অর্থ বহনে কোনো সীমা নেই: বাংলাদেশ ব্যাংক
অর্থ-বাণিজ্য: বিকাশ, নগদ, রকেটে টাকা পাঠাতে আর বাধা নেই