image

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী, যেসব পরিবর্তন আসবে

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় যেসব পরিবর্তন আসবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ায় দেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এখন তৃতীয় ধাপে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ১৯টি প্রস্তাবকে মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ গণভোটে অংশ নেন। ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৪ কোটি ৮০ লাখের বেশি এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ২৫ লাখের কিছু বেশি। ফলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো স্পষ্ট জনসমর্থন পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় সীমা ও ভারসাম্য

সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতে পারবেন না।বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কিছুটা কমবে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ভারসাম্য বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার বৃদ্ধি ও নিয়োগ কাঠামো

সংস্কার বাস্তবায়িত হলে কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ

সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার পরিধি বাড়বে। দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে মত দেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পেলে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বিতর্ক ও জবাবদিহিতা জোরদার হতে পারে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। একটি উচ্চকক্ষ যুক্ত হওয়ায় আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত পর্যালোচনার স্তর যুক্ত হবে। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসবে, ফলে কোনো একক দলের পক্ষে সহজে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।

গণ-অভ্যুত্থান থেকে গণভোট

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস–এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। প্রথম ছয়টি কমিশনের ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়। এগুলো নিয়েই তৈরি হয় জুলাই জাতীয় সনদ। ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগ অধ্যাদেশের মাধ্যমে নেই বলেই গণভোটের আয়োজন করা হয়।

বাস্তবায়নের তিন স্তর

সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য তিনটি স্তর নির্ধারিত হয়েছে—১. আইনি ভিত্তি: ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। ২. গণভোট: জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত অংশ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৩. সংস্কার পরিষদ: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ না হলে কী হবে—সে বিষয়ে আদেশে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।

সব মিলিয়ে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোয় ভারসাম্য আনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। এখন নজর থাকবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয় এবং নতুন সাংবিধানিক কাঠামো বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলে তার ওপর।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

» রংপুর তিন ভিভিআইপি প্রার্থীর দিনভর পাল্টাপাল্টি যত অভিযোগ

সম্প্রতি