ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তবে এই বিশাল জয়ের মাঝেও দলটির জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
বিদ্রোহীর কারণে ভোট ভাগাভাগি হওয়ায় তৃতীয় পক্ষের জয় হয়েছে
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাতজন বিদ্রোহী প্রার্থী জোটের প্রার্থীদের পরাজিত করে
দলের কঠোর হুঁশিয়ারি ও বহিষ্কারাদেশ উপেক্ষা করে মাঠে থাকা এই বিদ্রোহীদের ভোট ভাগাভাগির কারণে অনেক আসনে বিএনপির জোটসঙ্গী বা দলীয় প্রার্থীদের তৃতীয় পক্ষের কাছে পরাজিত হতে হয়েছে।
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ২৯৯টি আসনের মধ্যে ৭৯টিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এর নেতিবাচক প্রভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসনে ধানের শীষের ভরাডুবি হয়েছে। কোনো কোনো আসনে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে ধানের শীষ সরাসরি ধরাশায়ী হয়েছে।
বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সেই সব আসনে, যেখানে ভোট ভাগাভাগির সুযোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বা তাদের জোটের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্রোহী ও দলীয় প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে তা বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে বেশি হতো।
বিদ্রোহীর কারণে ভোট ভাগাভাগি হওয়ায় তৃতীয় পক্ষের জয় হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা-১২ আসন। এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক (কোদাল)। বিদ্রোহী ছিলেন বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব (ফুটবল)। ফলাফলে দেখা যায়, জামায়াতের প্রার্থী ৫৩ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অথচ জোট প্রার্থী (৩০,৯৬৩) এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর (২৯,৮৬৯), মোট ভোট (৬০,৮৩২) যা জামায়াত প্রার্থীর চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ কেবল অনৈক্যের কারণে এই আসনটি হাতছাড়া হয়েছে।
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছিলেন রাশেদ খান। তিনি ৫৫ হাজার ৬৭০ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছেন। সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ৭৫ হাজার ৭৫০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। তাদের দুজনের ভোট মিলে হয় ১ লাখ ৩১ হাজার ৪২০। অথচ ১ লাখ ৪ হাজার ৩১ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আবু তালিব। অনৈক্যের কারণে এই আসনটিও হাতছাড়া হয় ধানের শীষের।
ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম মোট ১ লাখ ১ হাজার ১১৩ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সানজিদা ইসলাম পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৩২৩ ভোট। সবমিলিয়ে এই আসনে মীর আহমাদ বিন কাসেম ১৭ হাজার ৭৯০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
আর স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক ফুটবল প্রতীকে ১৬ হাজার ৩২৮ ভোট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আবু ইউসুফ হাতপাখা প্রতীকে ৩ হাজার ৭৬০ ভোট পেয়েছেন।
সিলেট-৫ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক। কিন্তু বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশীদ মাঠে থাকায় ভোট ভাগ হয়ে যায়। ফলে জামায়াত জোটের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসান সহজেই জয়ী হন।
ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। তবে বিএনপির দলীয় প্রার্থী আখতারুল আলমের ভোট কেটে নেন বিদ্রোহী আখতার সুলতানা (সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী)। এই সুযোগে জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান ৭৫ হাজার ৯৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ৫২ হাজার ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হন।
নীলফামারী-৪ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী আবদুল গফুর সরকার ও বিদ্রোহী রিয়াদ আরফান সরকারের দ্বন্দ্বে আসনটি চলে যায় জামায়াতের আবদুল মুনতাকিমের দখলে।
বিএনপির শরিক দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেয়া ১৬টি আসনের মধ্যে ১২টিতেই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠে ছিলেন। এর ফলে শরিক দলের প্রার্থীরা চরম বিপাকে পড়েন।
পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয় বিএনপি। কিন্তু স্থানীয় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের শক্ত অবস্থানের কারণে নুরকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় এবং ভোটের মাঠে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও সিলেট-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীদের পরাজয়ের মূল কারণই ছিল বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
জিতেছেন সাত বিদ্রোহী
নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়া সাতজন বিদ্রোহী প্রার্থী সরাসরি দলীয় বা জোটের প্রার্থীদের পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এসব আসনে দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ পরাজিত হয়েছে ‘স্বতন্ত্র’ প্রতীকের কাছে।
বিএনপির বিদ্রোহীদের কাছে যারা হেরেছেন তাদের মধ্যে আছেন ময়মনসিংহ-১ আসনের বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। প্রিন্সকে পরাজিত করেছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। মাত্র ৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন কেন্দ্রীয় এই নেতা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জুনায়েদ আল হাবিবকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী রুমিন ফারহানা। রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ভোট, যেখানে জোট প্রার্থী পেয়েছেন ৮০ হাজার ভোট।
কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপি থেকে আসা বিএনপির দলীয় প্রার্থী রেদোয়ান আহমেদ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম শাওনের কাছে। শাওন পেয়েছেন ৯১ হাজার ৬৯০ ভোট, আর রেদোয়ান পেয়েছেন মাত্র ৪৮ হাজার ৫০৯ ভোট।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনেও দলীয় প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদাকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল।
এছাড়া টাঙ্গাইল-৩ আসনে লুৎফর রহমান খান আজাদ, চাঁদপুর-৪ আসনে আব্দুল হান্নান এবং দিনাজপুর-৫ আসনে এ জেড এম রেজওয়ানুল হক দলীয় প্রার্থীদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন।