image

প্রবীণ-নবীনের ভারসাম্য

কেমন হতে যাচ্ছে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, সেটি কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও বহন করছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন, এটি দেশীয় রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। প্রায় দুই দশক পর বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কেমন হবে তাঁর মন্ত্রিসভা। আর সেই মন্ত্রিসভা কী বার্তাই বা দেবে দেশ-বিদেশে?

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায়, ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের এই সময়টি সহজ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, প্রশাসনিক কাঠামোর আস্থাহীনতা, সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বহুমুখী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফলে মন্ত্রিসভা গঠন নিছক দলীয় সমীকরণে আটকে থাকছে না, বরং হয়ে উঠছে নীতি-অগ্রাধিকারের স্পষ্ট সিগন্যাল।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার আকার ৩৫ থেকে ৩৭ জনের মধ্যে সীমিত রাখা হতে পারে। অতীতের বড় আকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, তা মাথায় রেখেই এবার তুলনামূলক ছোট, কার্যকর ও ফলাফলমুখী টিম গঠনের ভাবনা। এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি। যেমন, এটি প্রশাসনিক ব্যয় কমানো ও দক্ষতা বৃদ্ধির বার্তা দেবে। একই সঙ্গে ‘সংযত নেতৃত্ব’ প্রদর্শনের চেষ্টা হিসেবেও দেখা যাবে।

অভিজ্ঞতা বনাম নবীন শক্তি

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য তালিকায় দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে পারে। একইভাবে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনীতি বা বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকতে পারেন। কারণ, তারেক রহমানের সরকারের বড় অগ্রাধিকার হবে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কূটনীতি।

আইন ও সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় উঠে আসছে সালাহউদ্দিন আহমদের নাম। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে আইন মন্ত্রণালয় বা সংসদ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে তাকে দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। একই সঙ্গে প্রবীণ রাজনীতিক হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক বা আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মতো ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতার ভারসাম্য রক্ষা হতে পারে।

তবে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় তরুণ ভোটারদের বড় অংশ বিএনপির পক্ষে ঝুঁকেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে মন্ত্রিসভায় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স- এসব খাতে দক্ষ নতুন মুখ আনার মাধ্যমে তরুণদের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা থাকতে পারে।

প্রথম পরীক্ষা: অর্থনীতি

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, রিজার্ভ সংকট ও শিল্পখাতে মন্দা- এসব মোকাবিলায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটিই হবে সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনের সূচক।

যদি অভিজ্ঞ ও বাজারমুখী দৃষ্টিভঙ্গির কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে। অন্যদিকে, যদি দলীয় আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে অর্থনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে বিশ্লেষকদের একাংশের।

প্রশাসনিক সংস্কার

নির্বাচনী ইশতেহারে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যাবে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সহিংসতা এড়ানো নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভারসাম্যের প্রশ্নটি আবার সামনে আসে। কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান নাকি সমঝোতামূলক রাজনৈতিক কৌশল? মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়েই এই প্রশ্নের প্রাথমিক উত্তর মিলবে।

জোট রাজনীতি

বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করলেও জোটভুক্ত দল ও আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ‘দলকেন্দ্রিক’ না হয়ে ‘রাষ্ট্রকেন্দ্রিক’ হওয়ার সুযোগ পাবে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন মন্ত্রিসভা হবে তিনটি বার্তার সমন্বয়- দলীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব, সংস্কারের অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রদর্শন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক নীতিনির্ধারণের বদলে অঞ্চলভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গেলে তা জাতীয় ঐক্যের বার্তা জোরদার করবে।

বাস্তব ফলাফল

মন্ত্রিসভা ঘোষণার মুহূর্তে রাজনৈতিক প্রতীক ও বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে ফলাফল। কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা- এসব সূচকে অগ্রগতি না এলে প্রতীকী ভারসাম্য খুব বেশি সময় টিকবে না।

সুতরাং তারেক রহমানের সামনে মূল প্রশ্ন- তিনি কি একটি রাজনৈতিকভাবে সন্তোষজনক মন্ত্রিসভা গঠন করবেন, নাকি একটি কার্যকর ও সংস্কারমুখী প্রশাসনিক টিম গঠন করবেন? বাস্তবতা বলছে, তাঁকে এই দুইয়ের সমন্বয় করতেই হবে।

সব মিলিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা হবে ক্ষমতার রূপান্তরের চেয়েও বেশি কিছু- এটি হবে আগামী পাঁচ বছরের রাষ্ট্রদর্শনের প্রথম রূপরেখা। এখন নজর ঘোষণার দিকে, যেখনে প্রত্যাশিত সেই ভারসাম্য, দক্ষতা ও সংস্কারের অঙ্গীকার প্রতিফলিত হয় কি না।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

সম্প্রতি