বাংলাদেশের নতুন যাত্রায় তারেক রহমান

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমান সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এটি শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘ দেড় দশকের এক অস্থির সময়ের পর নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শপথ গ্রহণ শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, সংসদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিকেলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচনের ফলাফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয় পেয়ে সরকার গঠনের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। ফলে দলের প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো তারেক রহমান সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

অভ্যুত্থান থেকে নির্বাচিত সরকার: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হচ্ছে।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র অনুযায়ী, সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ হয়েছে। বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ হবে। ঐতিহ্যগতভাবে বঙ্গভবনের দরবার হলে মন্ত্রিসভার শপথ হলেও এবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে, যা প্রতীকী দিক থেকে ব্যতিক্রমী বলে বিবেচিত হচ্ছে।

সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ালেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন ও মন্ত্রিসভার শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। প্রায় ১,২০০ দেশি-বিদেশি অতিথির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মন্ত্রিসভা নিয়ে জল্পনা: নতুন সরকারের যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মন্ত্রিসভা। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আর নবীন নেতাদের মিলে মন্ত্রিসভা গঠিত হচ্ছে। দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার মন্ত্রিসভা গঠনে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। দক্ষতা, সততা ও দূরদর্শিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা থাকছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করছেন, সরকারের প্রথম সিদ্ধান্ত ও মন্ত্রিসভার গঠনই নতুন প্রশাসনের চরিত্র সম্পর্কে প্রথম বার্তা দেবে।

ঐক্য ও স্থিতিশীলতা: তারেক রহমান ইতোমধ্যে বিভাজন দূর করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তাঁদের অগ্রাধিকার পাবে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যেও নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, শুরুতেই এমন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে যাতে বাজারে আস্থা ফিরে আসে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়।

ইতিহাসের প্রতিধ্বনি: এই মুহূর্তে অনেকের স্মৃতিতে ফিরে আসছে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সাল। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। বহুদলীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের সেই অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল। আবার ১৯৯১ সালে তাঁর মা খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সেই সময়ও ছিল রাজনৈতিক রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণ।

২০২৬ সালের এই মুহূর্তকে অনেকে সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখছেন, যেখানে একটি রাজনৈতিক পরিবার নয়, বরং একটি দল দীর্ঘ বিরোধী সময় পার করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছে।

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/17Feb26/news/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%95%20%E0%A6%B0%E0%A6%B9%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%20%282%29.JPG

চ্যালেঞ্জ: তবে নতুন যাত্রা মানেই সহজ পথ নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার পর প্রশাসনিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতি ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার পুনর্নির্মাণ- সবই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘ সময় আন্দোলনে থাকা একটি দল রাষ্ট্র পরিচালনায় কেমন পারফরম্যান্স দেখাবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। মন্ত্রিসভার গঠন, প্রথম ১০০ দিনের কর্মসূচি ও নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সরকারের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল শপথের দিন নয়, নতুন প্রত্যাশার দিনও। তারেক রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া এই অধ্যায় দেশের জন্য কতটা স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের পথ খুলে দেবে, তার উত্তর দেবে সময়।

‘রাজনীতি’ : আরও খবর

» এক বিষয়ে আটকে থাকবে না ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: মির্জা ফখরুল

সম্প্রতি