দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের ৫ সিটিতে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য’ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে চায় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমান কমিশনের মতে, যারা সরকারে থাকেন তারাই নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেন; নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয়। এবার ভোটের পরিবেশ ঠিক রাখতে একাধিক বৈঠক করেছে কমিশন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশসহ নির্বাচন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের প্রচারণার ক্ষেত্রেও আইন মানার সংস্কৃতি চালু করতে চায় হাবিবুল আউয়াল কমিশন। এ লক্ষ্যে দেয়া হয়েছে একগুচ্ছ নির্দেশনা, যা প্রতিপালনে বাধ্য করতে এবার কঠোর অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
শুরু থেকেই বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো বলছে, এই কমিশনের ওপর তাদের আস্থা নেই। তাদের দাবি, এই কমিশনের অধীনে কোন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনাস্থা দেয়া দলগুলোর আস্থা অর্জনের লক্ষ্যেই এবারের নগর নির্বাচনগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যাতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে তাদের আগ্রহী করে তোলা যায়।
আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের যেকোন দিন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ভোট হবে বলে জানিয়েছে ইসি। নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ইসির সক্ষমতা জানান দেয়ার পরীক্ষা। কারণ এসব নির্বাচনের প্রভাব আসন্ন সংসদ নির্বাচনের ওপর পড়বে।
ইসির তফসিল অনুযায়ী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মেয়র-কাউন্সিলর পদে ভোট হবে আগামী ২৫ মে। ইতোমধ্যে এই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা ও বাছাই পক্রিয়া শেষ হয়েছে। এখন চলছে আপিল নিষ্পত্তির কার্যক্রম।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি গাজীপুর সিটিতে দলীয় মেয়র পদে কোন প্রার্থী দেয়নি। অন্যান্য সিটিতেও প্রার্থী দেয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
তফসিল অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ১৬ মে, ভোট হবে ১২ জুন। আর রাজশাহী ও সিলেট সিটি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৩ মে, ভোট ২১ জুন।
নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিটি ভোট অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হলে জাতীয় নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ভোটে এলে নির্বাচন উৎসবমুখর হবে। বিএনপি না এলে ভোটের মাঠে আমেজ থাকবে না, ভোটাররাও ভোটদানে আগ্রহ হারাবে।
দেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রচারণার সময় নিয়ম না মানা এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত বিধিবিধান ও নির্দেশনা থাকলেও তা অমান্য করা হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শিথীলতার নজির অসংখ্য। তবে এবার সিটি ভোটে এ ক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরতে চায় কমিশন।
আসন্ন পাঁচ সিটি ভোটে প্রচারণা চালাতে একজন প্রার্থী একটি ওয়ার্ডে একটি মাইক (লাউড স্পিকার) ব্যবহার করতে পারবেন। দুপুর ২টার থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকে প্রচারণা চালানো যাবে, এর আগে-পরে নয়।
নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে প্রার্থীদের বিধিবিধান মনে করিয়ে দিতে এমন একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার উপ-সচিব মো. আতিয়ার রহমান।
ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, মেয়র পদপ্রার্থী প্রতি থানায় একের অধিক ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন না। কাউন্সিলর প্রার্থীরা ৩০ হাজার ভোটারের জন্য একটি ক্যাম্প, তবে সর্বোচ্চ তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে ক্যাম্প অফিসে টেলিভিশন, ভিসিআর, ভিসিডি ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবেন না। ভয়ভীতি প্রদর্শন, ধর্মীয় উপসনালয়, সার্কিট হাউজ, সরকারি স্থাপনা ব্যবহার করে প্রচার চালানো যাবে না। প্রচার কাজে যান চলাচলে বাধাগ্রস্ত করা কিংবা কারো ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকতে হবে।
পোস্টারের ক্ষেত্রে ঝুলিয়ে প্রচার চালাতে হবে। প্লাস্টিকের লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। দেওয়ালে বা কোন স্থাপনায় সাঁটানো যাবে না। পোস্টারের সাইজ দৈর্ঘ্যে ৬০ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ৪৫ সেন্টিমিটার এবং ব্যানার কোনভাবেই তিন মিটারের বেশি হবে না।
এছাড়া সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাদের সমপদমর্যাদার কোন ব্যক্তি, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না। তবে এদের কেউ ভোটার হলে কেবল ভোট দিতে পারবেন।
কোন প্রকার বিলবোর্ড বা মিছিল করা থেকেও বিরত থাকার জন্য বলা হয়েছে নির্দেশনায়। বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কোন প্রকার আলোকসজ্জা, সরকারি প্রচার যন্ত্র কিংবা প্রচারে সরকারি কর্মচারীকে ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতীক হিসেবে জীবন্ত কোন প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি পথসভা ও ঘরোয়া সভা ব্যতীত কোন জনসভা বা শোভাযাত্রা করতে পারবেন না। এছাড়া যানবাহন সহকারে মিছিল কিংবা মশাল মিছিল বা কোনরকম শোভাযাত্রা করা যাবে না।
এসব নির্দেশনা না মানলে শাস্তির আওতায় আনা হবে সংশ্লিষ্টদের। এক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। আর দল বা দলের পক্ষে কোন প্রতিষ্ঠান বিধিমালা লঙ্ঘন করলে ৫০ হাজার পর্যন্ত অর্থদন্ড দেয়ার বিধান আছে। এছাড়া কোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রার্থীর প্রার্থিতাও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে বাতিল করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
আইন অনুযায়ী, এসব বিধিমালা প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য যেকোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের লোকজনই (মন্ত্রী, এমপি) নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করছেন- এমন অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, কমিশনের পর্যবেক্ষণে এমনটাই পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের পাশপাশি সরকারি দলেরও দায়িত্ব আছে। কমিশন সরকারি দলের কাছে আরও দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে ইসির পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় পার্টির মহাসচিবকেও চিঠি দেয়া হয়েছে।
গাজীপুর সিটি ভোটে মনোনয়ন দাখিলের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খান মনোনয়ন দাখিলের সময় শোডাউন করায় তাকে ঢাকায় তলব করেছে ইসি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আজমত উল্লার আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি কমিশনের গোচরীভূত হওয়ায় তাকে আগামী ৭ মে বিকেল ৩টায় আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটে সিটি নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে, মনোনয়পত্র দাখিলের সময় কোন শোডাউন, মিছিল যাতে না করা হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।