আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবল তারকা কার্লোস তেভেজ ২০২৪ সালের মার্চ মাসে ‘এক্স’-এ একটি টুইট করেছিলেন। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন, বুয়েন্স আয়ার্সের উপকণ্ঠে রহস্যজনক কিছু ঘটছে। তেভেজের দাবি, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ অনেকবার ‘পিলার’ নামের এলাকায় যাচ্ছিলেন। সাবেক আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড আরও আভাস দেন, ওই ফুটবল কর্মকর্তা সেখানে বস্তাভর্তি টাকা পুঁতে রেখেছেন এবং প্রাচীন গাড়ির বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন।
তেভেজের এই পোস্টের পর প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ‘কোয়ালিসিওন সিভিকা’ তদন্ত শুরু করে এবং পিলারের একটি রহস্যময় ভিলাকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে।
বিশ্বকাপ দুয়ারে কড়া নাড়ছে, অভিযোগ উঠেছে, এই ভিলাটি অর্থপাচারের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। আর এটিই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ঘিরে তৈরি হওয়া ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
গত ডিসেম্বরের শুরুতে এএফএ সদর দপ্তর এবং এক ডজনেরও বেশি ফুটবল ক্লাবে অভিযান চালায় পুলিশ। এই অভিযান ছিল মূলত অর্থপাচার তদন্তের অংশ, যেখানে ক্লাব ও একটি আর্থিক পরিষেবা সংস্থা সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রবাহের বিষয়টি রয়েছে।
তিন দিন পর কর্তৃপক্ষ পিলার ভিলায় অভিযান চালিয়ে একটি হেলিপোর্ট, আস্তাবল ও ৫৪টি গাড়ি খুঁজে পায়, যার মধ্যে দামি লাক্সারি কার ছিল। ফৌজদারি অভিযোগে কোয়ালিসিওন সিভিকা দাবি করেছে যে, এই সম্পত্তিটি মূলত এএফএ সভাপতি চিকি তাপিয়া এবং কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনোর সঙ্গে জড়িত একটি অর্থপাচার চক্রকে আড়াল করার চেষ্টা। গত সপ্তাহে আরেকটি মামলায় আর্জেন্টিনার কর সংস্থা থেকে অভিযোগ আনা হয় যে, একজন প্রসিকিউটর এএফএপ্রধান তাপিয়া, তোভিগিনো ও অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে ১৩ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে রাখার অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে তাপিয়া ও তোভিগিনোর সাক্ষাৎকার বা মন্তব্য জানতে চাইলেও রয়টার্সকে কোনো সাড়া দেয়নি এএফএ। তবে এক বিবৃতিতে অ্যাসোসিয়েশন বলেছে যে, তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলাইয়ের সরকারের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। মিলাই আর্জেন্টিনার ফুটবল ক্লাবগুলোকে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করার জন্য চাপ দিচ্ছেন, যেগুলো দীর্ঘকাল ধরে অলাভজনক সংস্থা হিসেবে সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। ২০১৭ সালে তাপিয়া সভাপতি হওয়ার পর থেকে ২০২২ বিশ্বকাপসহ আর্জেন্টিনার জেতা বিভিন্ন শিরোপার তালিকা তুলে ধরে এএফএ জানিয়েছে, ‘আমরা সঠিক পথে আছি।’
সাক্ষাৎকারের অনুরোধ করলেও তেভেজের প্রতিনিধি সাড়া দেননি। তোভিগিনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মাঠে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স বেশ প্রশংসা পাচ্ছে, কিন্তু এএফএ গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনার ক্রীড়া সাংবাদিক নেস্তর সেন্ত্রা বলেছেন, বর্তমানে দুটি এএফএ বিদ্যমান। যার মধ্যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে সফল এবং অন্যটি দেশের ভেতরে চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। তেভেজের টুইটের কয়েক মাস পর কোয়ালিসিওন সিভিকার পিলারের শাখার সভাপতি মাতিয়াস ইয়োফে রয়টার্সকে জানান যে, তিনি ও তার সহকর্মীরা ওই ভিলায় কাজ করা প্রায় ১০ জন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ধারণা করছে, তোভিগিনো বা তাপিয়াই এই সম্পত্তির আসল মালিক। ইয়োফে জানান, একজন কর্মচারীর বর্ণনা অনুযায়ী তাপিয়া একবার হেলিকপ্টারে করে সেখানে এসে কর্মচারীদের ফুটবল জার্সি উপহার দিয়েছিলেন।
ইয়োাফে আরও বলেন, তারা যে বর্ণনা দিয়েছে, তাতে বলা যায় তারা (তাপিয়া ও তোভিগিনো) মালিকের মতোই সেখানে চলাফেরা করতেন, সুইমিং পুল এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করতেন। সবাই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই সম্পত্তি এএফএর লোকজনের।
কোয়ালিসিওন সিভিকার অভিযোগে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে মা-ছেলে আনা লুসিয়া কন্তে ও লুসিয়ানো নিকোলাস পান্তানোর মালিকানাধীন এক কোম্পানির মাধ্যমে কেনা হয়েছিল, অথচ এই সম্পত্তি কেনার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। এই ব্যাপারে পান্তানো পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী এক আইনজীবীর মন্তব্য জানতে চাইলে তিনিও সাড়া দেননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারিক মামলাগুলো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করবে বলে মনে হয় না। বুয়েন্স আয়ার্সের ক্রীড়া আইনজীবী অ্যালান ওয়াইল্ডার বলেছেন, এটা করার রাজনৈতিক মূল্য কোনোভাবেই কেউ পরিশোধ করতে পারবে না। কেউই মেসিকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেয়ার এমন ধারণা অনুমোদন করবে না, যেটা সম্ভবত তার শেষ বিশ্বকাপ।
প্রসঙ্গত: বিশ্ব ফুটবলে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিফা কর্মকর্তাদের বিরূদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাপিয়ার আগে এএফএর প্রধানের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাচ সম্প্রচারের তহবিল পরিচালনার অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তিনি পদত্যাগও করেন। এই মাসে ওই মামলায় অভিযুক্তরা খালাস পান।
বর্তমান কেলেঙ্কারির আগে থেকেই এএফএ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে ভক্তদের কাছ থেকে সমালোচনার মুখে ছিল। সম্প্রতি এএফএ অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার হোম টিম রোজারিও সেন্ট্রালকে একটি নতুন ও বিতর্কিত ট্রফি দেয়ার পর অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। বুয়েন্স আয়ার্সের ৩০ বছর বয়সী বাসিন্দা এঞ্জো গুতিয়েরেজ বলেছেন, আমার মনে হয় এবার সবকিছু উন্মোচিত হয়েছে। আমার মনোযোগ কেড়েছে এটি। কিন্তু আপনি যদি ফুটবলভক্ত হন, তাহলে জেনে থাকবেন এই ধরনের ঘটনা আর্জেন্টাইন ফুটবলে হয়ে থাকে।