image

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ দল ভারত সফর করবে না: বিসিবি

রোববার, ০৪ জানুয়ারী ২০২৬
ক্রীড়া বার্তা পরিবেশক

নিরাপত্তা ইস্যুতে জাতীয় দলের ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য আইসিসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এক জরুরি সভায় বোর্ড এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ দল ভারত সফর করবে না। সরকারের পরামর্শ ও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিসিবি এখন আইসিসির কাছ থেকে দ্রুত সাড়া প্রত্যাশা করছে।

রোববার,(০৪ জানুয়ারী ২০২৬) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ।

সেখানে বলা হয়েছে, ‘ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করতে রোববার বিকেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বোর্ড গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলী বিবেচনায় নিয়ে পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে এবং ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অংশগ্রহণের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি ও ভারতে অবস্থানকালীন বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান শঙ্কা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ্বকাপের জন্য ভারত সফর করবে না।’

আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, ইভেন্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে, যেন বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়। বোর্ড মনে করে যে, বাংলাদেশি খেলোয়াড়, দলের কর্মকর্তা, বোর্ড সদস্য ও অন্যান্য অংশীজনদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এবং একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আইসিসির পক্ষ থেকে দ্রুত সাড়া এবং বিষয়টি অনুধাবনের প্রত্যাশা করছে।’

এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে আইপিএলে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। গতকাল শনিবার ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় নেতাদের দাবির মুখে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই কলকাতা নাইট রাইডার্সকে তাদের ২০২৬ আইপিএলের স্কোয়াড থেকে মোস্তাফিজকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়।

চুক্তিবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক কারণে একজন বিশ্বমানের ক্রিকেটারকে এভাবে বাদ দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এ ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যেখানে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে পুরো জাতীয় দলের ভারত সফর কোনোভাবেই নিরাপদ হতে পারে না। তিনি বিসিবিকে আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি জানানোর জন্য কঠোর নির্দেশনা দেন।

শুরুতে বিসিবির পক্ষ থেকে ভেন্যু পরিবর্তনের বিষয়ে বিকল্প হাতে নেই বলে জানানো হয়েছিল। তবে সেই অবস্থান বদল করে সরকারের নির্দেশে ভিন্ন পথে হেঁটেছে তারা। তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির আগে রোববার ক্রীড়া উপদেষ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে লেখেন, ‘বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। আজ (রোববার) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।’

মোস্তাফিজ ইস্যুতে বিসিবির জোরালো

ভূমিকা চান আকরাম খান

আইপিএল থেকে পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার ঘটনায় বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক এবং সাবেক বিসিবি পরিচালক আকরাম খান। এই ঘটনাকে মোস্তাফিজের প্রতি ‘অন্যায়’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এর ফলে কেবল ক্রিকেটার নন, দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরাও বড় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

মোস্তাফিজের কেকেআরে সুযোগ পাওয়া নিয়ে শুরুতে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন আকরাম, ‘আমি এ ঘটনায় খুবই অবাক হয়েছি। মোস্তাফিজ ৯ কোটি টাকার বেশি মূল্যে কেকেআরে খেলবে শুনে আমি এবং দেশের ৮০ শতাংশ সমর্থক অনেক খুশি হয়েছিলাম। কলকাতা দলের হয়ে সাকিব আগে খেলেছে এবং এটি শাহরুখ খানের দল। এবার আমি নিজেও একটা ম্যাচও মিস না করার পরিকল্পনা করেছিলাম।’

‘১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ভারত আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছিল। ভেবেছিলাম মোস্তাফিজের মাধ্যমে দুই দেশের বর্তমান দূরত্ব ঘুচে যাবে। কিন্তু তাকে বাদ দেয়াটা মোস্তাফিজের প্রতি অন্যায়, কারণ ৯ কোটি টাকা অনেক বড় অংক।’ নিলামের আগে এনওসি বা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়ে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের সাবেক প্রধান আকরাম জানান, সাধারণত বিসিসিআই ক্রিকেটারদের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েই নিলামে অন্তর্ভুক্ত করে, ‘বিসিসিআই নিজেও এটি স্বীকার করেছে যে, প্রক্রিয়া মেনেই সব হয়েছে। তারা চাইলে বিকল্প খেলোয়াড় চাইতে পারতো, কিন্তু মোস্তাফিজের মতো একজন খেলোয়াড়কে নিয়ে এমন করাটা অনভিপ্রেত।’

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ক্রিকেটে পড়ছে বলে মনে করেন সাবেক এই অধিনায়ক। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ভয় হয় ভারত হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খেলা তাদের দেশে আয়োজন করতে চাইবে না। কলকাতার তিনটি ভেন্যু নিয়েও আমি শঙ্কিত।’ ‘আমরা আশা করেছিলাম, খেলাধুলার মাধ্যমে সম্পর্ক শীতল হবে কিন্তু বর্তমানে দূরত্ব বাড়ছে। ইতোমধ্যে দ্বিপক্ষীয় সফরগুলো স্থগিত হয়েছে।’

বিদ্যমান সংকটে বিসিবির জোরালো ভূমিকা দেখতে চান আকরাম, ‘বিসিবির উচিত ছিল অনেক আগে থেকেই এসব বিষয়ে কাজ করা। এখন আমাদের নিজেদের কথাগুলো অনেক জোরালোভাবে বলতে হবে। ভারতকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকলে চলবে না, বরং সাহসের সঙ্গে আমাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করতে হবে। আইসিসি চুপ থাকলেও আমাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কথা বলতে হবে।’

শক্ত থাকো মোস্তাফিজ, পুরো জাতি তোমার পাশে: তাবিথ আউয়াল

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স।

যা নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গনে সমালোচনার ঝড় বইছে। সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা এ সম্পর্কে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ক্রিকেটাঙ্গন তো বটেই বাদ যায়নি ফুটবলসহ অন্যান্য ডিসিপ্লিনও, সব জায়গা থেকেই মোস্তাফিজ ইস্যুতে সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মোস্তাফিজের পাশে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল।

খেলাকে রাজনীতির সঙ্গে মেলানোর এমন কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন বাফুফে সভাপতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড পেইজে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে তাবিথ লিখেছেন, ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স তাদের দলের জন্য মোস্তাফিজুর রহমানকে নির্বাচন করা সত্ত্বেও কেবল রাজনৈতিক চাপের কারণে তাকে আইপিএল ২০২৬ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে জেনে আমি অত্যন্ত হতাশ।

মোস্তাফিজ একজন বিশ্বমানের অ্যাথলেট, যিনি নিজের দক্ষতা ও পারফরম্যান্স দিয়ে সেখানে জায়গা করে নিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তার জাতীয়তার কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা একজন খেলোযাড়ের প্রতি অবিচার এবং অসহিষ্ণুতার চরম বহিঃপ্রকাশ, যা ক্রিকেটের মতো জেন্টলম্যানস গেমে মোটেও কাম্য নয়। আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং বিসিসিআই-এর প্রতি আহ্বান জানাই, খেলাধুলাকে রাজনীতিকরণ করা বন্ধ করুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘খেলাধুলার অসীম শক্তি আছে বিভেদ ভুলে মানুষকে এক করার। একে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে, আসুন একে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধা তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করি।’

মোস্তাফিজের পাশে থাকার কথা জানিয়ে তাবিথ বলেন, ‘শক্ত থাকো মোস্তাফিজ। পুরো জাতি আজ তোমার পাশে আছে।’

‘খেলা’ : আরও খবর

» মোস্তাফিজের বিষয়ে অফিসিয়ালি জানার পর কথা বলবেন বুলবুল

সম্প্রতি