আফ্রিকা নেশন্স কাপ (অ্যাফকন) ফাইনালে নাটকের পর নাটক। পেনাল্টি দেয়ায় ফুটবলারদের ওয়াক আউট, রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে মাঠ ছাড়েন সেনেগালের ফুটবলাররা। বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে খেলা। শেষ পর্যন্ত মরক্কোকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেনেগাল দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে।
অনেক চেষ্টা করেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দল গোল করতে পারেনি। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে গোল করে সেনেগাল। তবে রেফারি সেই গোল বাতিল করেন। কারণ হেডে গোল করার আগে বক্সে মরক্কোর ফুটবলারকে ফাউল করেছিলেন সেনেগালের ফুটবলার।
পরের মিনিটেই সেনেগালের বক্সে ফাউল করা হয় মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজকে। রেফারি পেনাল্টি দেন। সেনেগালের ফুটবলাররা প্রতিবাদ করেন। তখন ভার প্রযুক্তির সাহায্য নেন রেফারি। তারপরেও সিদ্ধান্ত বদলাননি তিনি। রেফারির সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে সেনেগালের কোচ পাপে বৌনা থিয়াও সব ফুটবলারকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মেনে সেনেগালের ফুটবলাররা মাঠ ছাড়েন।
সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সেনেগালের কোচকে অনেকবার মাঠে নামার আবেদন করেন চতুর্থ রেফারি। তাতেও কাজ হয়নি, শেষ পর্যন্ত সেনেগালের অধিনায়ক সাদিও মানের কথা শুনে মাঠে নামেন ফুটবলারেরা। প্রায় ২০ মিনিট বন্ধ থাকার পর শুরু হয় খেলা।
নাটকের তখনও বাকি ছিল। খেলা শুরুর পর পেনাল্টি নিতে যান দিয়াজ। রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলা দিয়াজ পানেনকার শট তৎপর ছিলেন সেনেগালের গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি বল ধরে নেন। মনে হচ্ছিল, খেলা টাইব্রেকারে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বক্সের বাইরে থেকে বাঁপায়ের জোরালো শটে গোল করেন সেনেগালের পাপা গুয়েই। তারপর আর ফেরার সুযোগ ছিল না মরক্কোর। দ্বিতীয়বার অ্যাফকন চ্যাম্পিয়ন হয় সেনেগাল। আফ্রিকার এই প্রতিযোগিতা জেতার আশা শেষ হয়ে যায় মরক্কোর।
দিয়াজের পেনাল্টি মিস ও সেনেগালের নির্লিপ্ততা: জন্ম দিচ্ছে নানা রহস্যের
আফ্রিকান নেশন্স কাপের ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি পায় মরক্কো। সেনেগালের ডিফেন্ডার এল হাদজি মালিক দিউফের চ্যালেঞ্জে দিয়াজ ডি-বক্সে পড়ে গেলে দীর্ঘ ‘ভিএআর’ পর্যালোচনার পর পেনাল্টির বাঁশি বাজান কঙ্গোর রেফারি জঁ-জ্যাক এনডালা। রেফারির এই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সেনেগাল শিবির। কোচ মাঠ থেকে খেলোয়াড়দের তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এমনকি বেশ কয়েকজন ফুটবলার টানেলের দিকে হাঁটা শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় পর সাদিও মানের হস্তক্ষেপে মাঠে ফিরতে রাজি হয় সেনেগালের খেলোয়াড়রা।
সেই বিশৃঙ্খলা আর নাটকের মধ্যে পেনাল্টি শট নেওয়ার জন্য দিয়াজকে প্রায় ১৭ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। স্নায়ুর চাপের সেই মুহূর্তে দিয়াজ এর নেওয়া দুর্বল চিপটি অনায়াসেই লুফে নেন সেনেগাল গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি। মেন্ডি যখন নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দিলেন, তখন সেনেগালের কোনো খেলোয়াড়কে উল্লাস করতে দেখা যায়নি। বরং তারা দ্রুত নিজেদের অবস্থানে ফিরে যাচ্ছিলেন।
আর এই রহস্যজনক আচরণই উসকে দিচ্ছে নতুন বিতর্ক। ইএসপিএন-এর বিশেষজ্ঞ ডেল জনসন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সেনেগাল উদযাপন করেনি কেন? মাঠ ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পর দিয়াজ কি তবে ইচ্ছাকৃতভাবে মিস করে তাদের মাঠে ফেরার পথ করে দিয়েছিলেন?’ ইতালীয় সাংবাদিক তানক্রেদি পালভেরিও একই সুরে সন্দেহ প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মেন্ডি পেনাল্টি বাঁচানোর পরও সেনেগালের খেলোয়াড়রা কেন পাথরের মতো শান্ত ছিলেন? তার মতে, এই মিস ছিল সুপরিকল্পিত। প্রেস বক্সে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যেও এই একই আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
ম্যাচ শেষে মেন্ডি বলেন, ‘সে পানেনকা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি বিভ্রান্ত হইনি। আমি আমার জায়গায় স্থির ছিলাম এবং দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলাম।’
দীর্ঘ বিরতিই কি দিয়াজের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল? মরক্কোর কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই অন্তত তেমনটাই মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘পেনাল্টি নেওয়ার আগে সে অনেকটা সময় পেয়েছিল যা তাকে বিচলিত করেছে। তবে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমরা শিরোপার খুব কাছে ছিলাম, কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে এমনই নিষ্ঠুর হয়।’
তবে আলোচনা ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে উঠেছে দিয়াজের সেই পেনাল্টি মিস এবং সেনেগালের ফুটবলারদের আচরণ। এদিকে মাঠের সেই বিশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন মরক্কোর কোচ। তিনি বলেন, ‘আফ্রিকার ফুটবলের যে চিত্র আজ ফুটে উঠেছে তা লজ্জাজনক। একজন কোচ কীভাবে তার খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে বলেন! পাপে যা করেছেন তা ফুটবলের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করেছে।’