টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দিলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) নজিরবিহীন আইনি ও আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলা করতে হতে পারে।
আইসিসির ‘মেম্বার পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ (MPA) বা অংশগ্রহণ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর নির্দিষ্ট সময় আগে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পর তা থেকে সরে দাঁড়ালে তা চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। তবে বিসিবি পাল্টা যুক্তি হিসেবে ‘ফোর্স মেজিউর’ (Force Majeure) বা অনিবার্য কারণ সংক্রান্ত ধারাটি ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়াও বিসিবি বর্তমানে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে যাতে তারা গ্রুপ পরিবর্তনের প্রস্তাবে রাজি হয়।
ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে আইসিসি বিসিবির ওপর ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটি টাকা) পর্যন্ত আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে পারে। এছাড়া টুর্নামেন্টের লজিস্টিক পরিকল্পনা বিঘ্নিত হওয়া এবং ব্রডকাস্টারদের ক্ষতির দায়ভারও আংশিকভাবে বিসিবির ওপর বর্তানোর আইনি সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে আইসিসির রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমানে আইসিসির লভ্যাংশ বন্টন কাঠামো অনুযায়ী বিসিবি যে বাৎসরিক বরাদ্দ পায়, চুক্তিবদ্ধ টুর্নামেন্ট বর্জন করলে ভবিষ্যতে সেই বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে আইসিসি বোর্ড।
এছাড়া, ২০২৪-২০২৭ চক্রের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে স্পন্সরশিপ এবং সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশও স্থগিত করা হতে পারে। বাণিজ্যিক অংশীদাররা ‘গ্লোবাল ভিজিবিলিটি’ বা বৈশ্বিক উপস্থিতির অভাব দেখিয়ে বর্তমান চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে পারে, যা বিসিবির অভ্যন্তরীণ ক্রিকেট উন্নয়ন ও ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
সূত্র মতে, প্রশাসনিক ও লজিস্টিক দিক থেকেও বিসিবিকে বেশ কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে। বিশ্বকাপ বর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বাংলাদেশের ভোট বা প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আইসিসি ইভেন্ট (যেমন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) থেকে সাময়িক স্থগিতাদেশ পাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে বিসিবির অর্থ কমিটি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, ২০২৭ সাল পর্যন্ত তাদের আয়ের সিংহভাগ ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা আছে এবং সরাসরি টুর্নামেন্ট আয় থেকে প্রাপ্ত অংশের বাইরে তাদের মূল তহবিলে বড় কোনো টান পড়বে না। তবুও খেলোয়াড়দের ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ভ্যালু হারানোর বিষয়টি মাঠের বাইরে এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
বিসিবির আইনি পরামর্শক ব্যারিস্টার মাহিন রহমান জানিয়েছেন, আইসিসি যদি জরিমানার পথে হাঁটে, তবে বিসিবি পাল্টা যুক্তি হিসেবে ‘ফোর্স মেজিউর’ বা অনিবার্য কারণ সংক্রান্ত ধারাটি ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিসিবির দাবি, ভারতের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকিগুলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে স্বাভাবিক ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব। বিসিবি ইতিমধ্যে আইসিসিকে শতাধিক প্রামাণ্য লিংক ও ভিডিও পাঠিয়েছে, যেখানে ভারতীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের বাংলাদেশকে দেওয়া হুমকির প্রমাণ রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে কূটনৈতিক দিক থেকে এই সংকট এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের উত্থাপিত নিরাপত্তা শঙ্কাগুলো ‘যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য’। এমনকি বাংলাদেশ যদি বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তবে পাকিস্তানও তাদের অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনা করতে পারে, এমন এক প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে পিসিবি বর্তমানে তাদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
এই পদক্ষেপ বিশ্ব ক্রিকেটে একটি ‘এশীয় জোট’ তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আইসিসি এবং স্বাগতিক ভারতের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে।
লজিস্টিক দিক থেকেও বিসিবি একটি সূক্ষ্ম চাল চালছে। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বর্তমানে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন যাতে তারা গ্রুপ পরিবর্তনের (Group Swap) প্রস্তাবে রাজি হয়। এতে আইসিসির কোনো ম্যাচ বাতিল করতে হবে না, শুধু ভেন্যু পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে আইসিসি এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাবে নমনীয় হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়নি।
বিসিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যদি আইসিসি তাদের দাবি নাকচ করে দেয়, তবে তারা ‘সম্মানজনক বিচ্ছেদ’ বা ম্যাচ ওয়াকওভারের পথ বেছে নিতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অনিরাপদ ভেন্যুতে দল পাঠাবে না। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিসিবির এই আইনি ও কূটনৈতিক অবস্থানের চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে।
অর্থ-বাণিজ্য: ৬ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা
অর্থ-বাণিজ্য: খেলাপি ঋণ নবায়নে বিশেষ সুবিধা জাহাজনির্মাণ শিল্পে
অর্থ-বাণিজ্য: ফের দরপতন শেয়ারবাজারে