image

সংবাদ বিশ্লেষণ

বিশ্বকাপ বর্জন ও বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ: এক অনিশ্চিত গন্তব্যের হাতছানি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

সূত্র ম‌তে, ​প্রশাসনিক ও লজিস্টিক দিক থেকেও বিসিবিকে বেশ কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে। বিশ্বকাপ বর্জনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বাংলাদেশের ভোট বা প্রভাব ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আইসিসি ইভেন্ট (যেমন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) থেকে সাময়িক স্থগিতাদেশ পাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যদি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এই মেগা ইভেন্ট বর্জন করে, তবে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়তে পারে। এই সম্ভাব্য বর্জনের প্রভাব কেবল একটি টুর্নামেন্ট মিস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর রেশ থাকবে পরব‌র্তী সময়েও।

​প্রথমত, র‍্যাঙ্কিং ও সরাসরি অংশগ্রহণের যোগ্যতায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বকাপে অংশ না নিলে অন্য দলগুলো পয়েন্ট বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে, যেখানে বাংলাদেশ স্থবির হয়ে থাকবে। এর ফলে আগামী ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ সরাসরি খেলার যোগ্যতা হারাতে পারে এবং সহযোগী দেশগুলোর মতো বাছাইপর্ব বা কোয়ালিফায়ার খেলে মূল পর্বে আসতে হতে পারে। এটি বাংলাদেশের মতো একটি পূর্ণ সদস্য দেশের জন্য হবে চরম মর্যাদাহানি। এছাড়া, ভারতের মতো প্রভাবশালী ক্রিকেট বোর্ডের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ আয়োজনেও বড় বাধার সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ক্যাশ কাউ’ বা আয়ের উৎস; তাদের সাথে খেলা বন্ধ হলে বিসিবির দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথ সংকুচিত হবে।

​দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের কদর নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বকাপ হলো এমন এক মঞ্চ যেখানে ক্রিকেটাররা নিজেদের প্রতিভা বিশ্বজুড়ে তুলে ধরেন। রিশাদ হোসেন বা তাওহীদ হৃদয়ের মতো তরুণ ক্রিকেটাররা যদি এই মঞ্চে খেলার সুযোগ না পান, তবে বিগ ব্যাশ বা এসএ২০-র মতো লিগগুলোতে তাদের দল পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়বে। এছাড়া ভারতের প্রভাব বলয়ে থাকা লিগগুলোতে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের জন্য অলিখিত ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা নিষেধাজ্ঞা আসার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এতে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও আর্থিক সচ্ছলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

​তৃতীয়ত, আইনি ও লজিস্টিক জটিলতা বিসিবিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। আইসিসির ‘অংশগ্রহণ চুক্তি’ ভঙ্গের দায়ে বড় অংকের জরিমানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের অধিকার হারাতে পারে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ হারানোর পর, ২০২৬-এর এই বিতর্ক বাংলাদেশকে একটি ‘অস্থিতিশীল ক্রিকেটীয় দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। যদিও বিসিবির অর্থ কমিটি দাবি করছে যে ২০২৭ সাল পর্যন্ত তাদের আয় সুরক্ষিত, কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে নতুন স্পন্সরশিপ এবং সম্প্রচার স্বত্ব পেতে বোর্ডকে হিমশিম খেতে হবে।

আইসিসির ‘মেম্বার পার্টিসিপেশন এগ্রিমেন্ট’ (MPA) বা অংশগ্রহণ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর নির্দিষ্ট সময় আগে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পর তা থেকে সরে দাঁড়ালে তা চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। এমন পরিস্থিতিতে আইসিসি বিসিবির ওপর ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটি টাকা) পর্যন্ত আর্থিক জরিমানা আরোপ করতে পারে। এছাড়া টুর্নামেন্টের লজিস্টিক পরিকল্পনা বিঘ্নিত হওয়া এবং ব্রডকাস্টারদের ক্ষতির দায়ভারও আংশিকভাবে বিসিবির ওপর বর্তানোর আইনি সুযোগ রয়েছে।

​দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব হিসেবে আইসিসির রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমানে আইসিসির লভ্যাংশ বন্টন কাঠামো অনুযায়ী বিসিবি যে বাৎসরিক বরাদ্দ পায়, চুক্তিবদ্ধ টুর্নামেন্ট বর্জন করলে ভবিষ্যতে সেই বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে আইসিসি বোর্ড।

এছাড়া, ২০২৪-২০২৭ চক্রের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে স্পন্সরশিপ এবং সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশও স্থগিত করা হতে পারে। বাণিজ্যিক অংশীদাররা ‘গ্লোবাল ভিজিবিলিটি’ বা বৈশ্বিক উপস্থিতির অভাব দেখিয়ে বর্তমান চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে পারে, যা বিসিবির অভ্যন্তরীণ ক্রিকেট উন্নয়ন ও ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কর‌তে পা‌রে।

‘খেলা’ : আরও খবর

সম্প্রতি