টি-২০ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে আইসিসির বাদ দেয়া প্রসঙ্গে ডি ভিলিয়ার্স
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের বাদ পড়াকে ক্রিকেটের জন্য ‘বাজে দৃষ্টান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স। তার মতে, পরিস্থিতি কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত ছিল না।
নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজে ‘৩৬০ লাইভ’ শীর্ষক একটি লাইভ সেশনে ডি ভিলিয়ার্সের কাছে জানতে চাওয়া হয়, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকাকে তিনি কীভাবে দেখছেন। জবাবে সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘আমি এখানে পক্ষপাতদুষ্ট হতে চাই না, তাই মাঝামাঝি অবস্থানেই থাকব। এটা রাজনীতি, আবার ব্যক্তিগত বিষয়ও। এ বিষয়ে মন্তব্য করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য আমার কাছে নেই।’
গত শনিবার আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, ফেব্রুয়ারি ৭ থেকে শ্রীলঙ্কা ও ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতের বাইরে সরানোর অনুরোধ বিসিবি জানালেও আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করে।
আইসিসি ও বিসিবির মধ্যে কয়েক সপ্তাহের টানাপোড়েনের পর এই সিদ্ধান্ত আসে। পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয় ৩ জানুয়ারি, যখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেয়। এর পরদিন, ৪ জানুয়ারি, বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসির কাছে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরানোর অনুরোধ জানায়, নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে।
তবে চূড়ান্ত বিবৃতিতে আইসিসি জানায়, ভারতে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি’ তারা খুঁজে পায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ডি ভিলিয়ার্স স্পষ্ট করে বলেন, বিষয়টি এতদূর গড়ানোই উচিত হয়নি। ‘আমি যা জানি, তা হলো, এটা দুঃখজনক। এমন অবস্থায় কোনো দলকে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হওয়া কখনোই কাম্য নয়। এটা আমাদের খেলাটার জন্য সত্যিই বাজে এক চিত্র।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘যারা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতায় আছেন, তাদেরই বিষয়টি মীমাংসা করা উচিত। ক্রিকেটে রাজনীতি এতটা ঢুকে পড়–ক, আমি সেটা একেবারেই অপছন্দ করি। সত্যিই খুব দুঃখজনক।’
আইসিসির সিদ্ধান্তের ‘ন্যায্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন ইউসুফের
শ্রীলঙ্কা ও ভারতে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তকে অন্যায্য বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
নিজের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে ইউসুফ লেখেন, ‘নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড, নেপাল, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানÑ এই ১০ দেশের সম্মিলিত ক্রিকেট দর্শকসংখ্যা মোটামুটি বাংলাদেশের একার দর্শকসংখ্যার সমান।’ সংখ্যা তুলে ধরে সাবেক এই ব্যাটিং গ্রেট আরও উল্লেখ করেন, উল্লিখিত ১০ দেশের সম্মিলিত ভিউয়ারশিপ যেখানে প্রায় ‘১৭৮ মিলিয়ন’, সেখানে বাংলাদেশ একাই যোগান দেয় ‘১৭৬ মিলিয়ন’ দর্শক।
ইউসুফের মতে, বৈশ্বিক দর্শকের ওপর নির্ভরশীল এই খেলায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যৌক্তিক উদ্বেগকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি বলেন, ‘যখন কোনো খেলায় বৈশ্বিক দর্শকই মূল চালিকাশক্তি, তখন বাংলাদেশের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করা ধারাবাহিকতা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। যখন সমন্বয় বা ছাড় দেওয়া বেছে বেছে করা হয়, তখন ন্যায্যতা হারিয়ে যায়। ক্রিকেট প্রভাব দিয়ে পরিচালিত হতে পারে না, এটা হতে হবে নীতির ভিত্তিতে।’
গত শনিবার আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, টুর্নামেন্ট শুরুর এত কাছাকাছি সময়ে সূচি পরিবর্তন করা লজিস্টিক্যালভাবে কঠিন, এই যুক্তিতে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বা যাচাইযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি’ তারা খুঁজে পায়নি।
এভাবে বিশ্বকাপ খেলতে চায়নি স্কটল্যান্ড
বাছাইপর্ব পেরুতে না পারা স্কটল্যান্ডের সামনে মার্চের আগে কোনো খেলা ছিল না। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়া আচমকা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দুয়ার খুলে দিয়েছে তাদের। এভাবে বিশ্বকাপ খেলতে না চায়নি তারা, তবে সুযোগ পেয়ে যাওয়া কাজে লাগাতেও মরিয়া তারা। যাদের জায়গায় বিশ্বকাপ খেলবে স্কটল্যান্ড সেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য সহানুভূতি জানিয়েছে দলটি।
বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে আসা স্কটল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী ট্রুডি লিন্ডব্লেড এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা এভাবে কোনো বিশ্বকাপে অংশ নিতে চাইনি। বিশ্বকাপের একটি নির্দিষ্ট কোয়ালিফিকেশন প্রক্রিয়া থাকে। আমরা যেভাবে এবার বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি বা আমন্ত্রিত হয়েছি, সেভাবে কেউই কোয়ালিফাই করতে বা উপস্থিত হতে চায় না।’
তিনি বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বেদনা অনুভব করার কথা জানান, ‘আমরা স্বীকার করি যে আমাদের অংশগ্রহণটি একটি বিশেষ এবং অনন্য পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য আমাদের সত্যিই খারাপ লাগছে।’
স্কটল্যান্ড দলে আফগান বংশোদ্ভূত
নানা নাটকীয়তায় বাংলাদেশ বাদ পড়ার পর জায়গা পাওয়া স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করেছে। এই দলে বড় চমক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন আফগান বংশোদ্ভূত পেসার জাইনুল্লাহ ইহসান।
সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা জাইনুল্লাহ দলটির একমাত্র আনক্যাপড খেলোয়াড়।
গত মাসে দায়িত্ব নেয়া নতুন প্রধান কোচ ওয়েন ডকিন্সের অধীনে এটাই প্রথম দল নির্বাচন। হঠাৎ এই সুযোগ পাওয়া নিয়ে কোচ ডকিন্স বলেন, ‘গত ৪৮ ঘণ্টা আমাদের জন্য ঝড়ের মতো কেটেছে। বিশ্বকাপ খেলার খবর পাওয়ার পর থেকে আমাদের সাপোর্ট স্টাফ এবং খেলোয়াড়রা সবকিছু গুছিয়ে নিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় না পেলেও আমাদের খেলোয়াড়রা মাঠে প্রভাব ফেলতে প্রস্তুত।’
আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্কটল্যান্ড তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের বিশ্বকাপের অ্যাক্রেডিটেশন না দেয়ার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ বাদ পড়ার পর বাংলাদেশি সাংবাদিকদেরও অ্যাক্রেডিটেশন দেয়নি আইসিসি। তারা এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতকে ‘অনিরাপদ’ বলাতেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এনডিটিভি-র সঙ্গে আলাপকালে আইসিসির একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে ভারত ভ্রমণকে ‘অনিরাপদ’ বলে বাংলাদেশ সরকার যে মন্তব্য করেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘তাদের ভিসা বা অ্যাক্রেডিটেশন দেয়া হয়নি কারণ সরকার ক্রমাগত বলে আসছিল যে ভারতে আসা নিরাপদ নয়।’
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে যারা আগে অ্যাক্রেডিটেশন অ্যাপ্রুভাল ও ভিসা লেটার পেয়েছিলেন, তাদেরও ফিরতি মেইলে তা বাতিলের কথা জানানো হয়। বাকিদের মেইল দিয়ে জানানো হয়েছে যে তাদের আবেদন গৃহীত হয়নি।
শতাধিক বাংলাদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বাংলাদেশের মিডিয়া অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। এ নিয়ে বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, আইসিসির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে, ‘এটা তো গতকাল ( সোমবার) সিদ্ধান্ত এসেছে, এরপর আমরা জানতে চেয়েছি, ব্যাখ্যা চেয়েছি। ওটা ভেতরকার গোপনীয় বিষয় কিন্তু আমরা জানতে চেয়েছি।’