২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের টিকেট নিয়ে শুরু থেকেই আগ্রহ-উন্মাদনার পারদ ছিল তুঙ্গে। কিন্তু ফিফার অফিসিয়াল রিসেল প্ল্যাটফর্মে টিকেটের যে ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করার পাশাপাশি গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মূল বিক্রয়পর্ব শেষ হওয়ার পর জানুয়ারিতেই অধিকাংশ টিকেট বিতরণ হলেও, সেই টিকেটই এখন রিসেল সাইটে উঠছে আসল দামের কয়েকগুণ, কোথাও আবার কয়েক দশকগুণ বেশি দামে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সতর্ক করেছিলেন, রিসেল প্ল্যাটফর্মে টিকেট উঠলে সেগুলোর দাম হবে ‘অস্বাভাবিক রকমের চড়া’। বাস্তবে সেই আশঙ্কাই এখন নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে, আর সেটিও বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার নিজস্ব প্ল্যাটফর্মেই।
গত বুধবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আগামী ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী ম্যাচে (মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা) গ্যালারির সবচেয়ে উঁচু অংশের আসন হিসেবে পরিচিত ‘ক্যাটাগরি থ্রি’ টিকেট রিসেল সাইটে তালিকাভুক্ত ছিল ৫,৩২৪ ডলারে। অথচ এই টিকেটের মূল মূল্য ছিল মাত্র ৮৯৫ ডলার।
এর চেয়েও চরম চিত্র দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকেটে। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অনুষ্ঠিত ফাইনালের জন্য একটি ক্যাটাগরি থ্রি টিকেট রিসেল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপিত হচ্ছে অবিশ্বাস্য ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫০ ডলারে, যা এর মূল মূল্য ৩,৪৫০ ডলারের তুলনায় ৪১ গুণেরও বেশি। এমনকি ফাইনালের সবচেয়ে সস্তা টিকেটের দামও রিসেল সাইটে উঠে গেছে ৯,৭৭৫ ডলারে। যদিও হাতেগোনা কিছু ক্ষেত্রে দাম পতনের নজিরও রয়েছে। যেমন, ক্যালিফোর্নিয়ার লেভিস স্টেডিয়ামে (যেখানে সম্প্রতি সুপার বোল অনুষ্ঠিত হয়েছে) অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের একটি গ্রুপ ম্যাচের টিকেট রিসেলে বিক্রি হচ্ছে ৫৫২ ডলারে, যেখানে মূল ক্রেতা সেটি কিনেছিলেন ৬২০ ডলারে।
তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গত ডিসেম্বরের ড্রয়ের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এই মূল্যবৃদ্ধি তারই বাস্তব প্রতিফলন। ফ্রান্স জাতীয় দলের সমর্থকগোষ্ঠী ‘ইরেসিস্টিবল ফ্রঁসেজ’-এর মুখপাত্র গিয়োম ওপত্রে (যাদের সদস্য প্রায় ২,৫০০ জন) বলেন, ‘এই অস্বাভাবিক দামের বিষয়টি আমাকে দুঃখজনকভাবে অবাক করেনি। আমরা জানি এবং যার বিরুদ্ধে লড়াই করি, সেটাই আবার প্রমাণ হলো, অনেকে টিকেট কেনে শুধু পুনর্বিক্রির জন্য। শেষপর্যন্ত ক্ষতিটা হয় কার? প্রকৃত, নিবেদিত সমর্থকদেরই, যারা অবাস্তব দামের মুখে পড়ে। আমরা চাইতাম এই সুযোগ যাক সত্যিকারের সমর্থকদের হাতে, যারা দলকে সমর্থন করতে মাঠে আসে, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
অস্বাভাবিক দামের পরও টিকেট বিক্রি থেমে নেই। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বিশ্বকাপের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টিকেট আবেদন জমা পড়েছে, যা বৈশ্বিক উন্মাদনারই স্পষ্ট প্রমাণ।
ফিফার রিসেল প্ল্যাটফর্মে পুনর্বিক্রয় বৈধ হলেও সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, তারা এখানে কেবল একটি ‘ফ্যাসিলিটেটর’ বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে, ১৫ শতাংশ ফি’র বিনিময়ে। টিকেটের দাম নির্ধারণ করেন বিক্রেতারাই।
এক বিবৃতিতে ফিফা বলেছে, ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মূল্য নির্ধারণ কাঠামো মূলত আমাদের আয়োজক দেশগুলোর বড় ক্রীড়া ও বিনোদন ইভেন্টে প্রচলিত বাজারব্যবস্থারই প্রতিফলন। এটি টিকেটের সেকেন্ডারি মার্কেটের আইনি বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে পরিচালিত হয়। আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সমর্থকদের জন্য খেলাটিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেই মনোযোগী।’
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় টিকেটের পুনর্বিক্রয় বাজার কার্যত অনিয়ন্ত্রিত। মেক্সিকোতে মূল দামের বেশি দামে টিকেট বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও, সেই আইন কার্যকর হয় কেবল তখনই, যখন টিকেট মেক্সিকোতে স্থানীয় মুদ্রায় কেনা হয়।
টিকেট ইস্যু এখন বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। ইউরোপের বিভিন্ন সমর্থক সংগঠন, যেমন ‘ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ’, এই মূল্যনীতিকে কেন্দ্র করে ফিফার বিরুদ্ধে ‘মহাবিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তুলেছে। এর জেরে ফিফা অফিসিয়াল সমর্থকগোষ্ঠীগুলোর জন্য সীমিতসংখ্যক ৬০ ডলারের টিকেট চালু করে। তবে সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগ সমস্যার মূল সমাধান করতে ব্যর্থ।
এদিকে ফিফা জানিয়েছে, গত জানুয়ারিতে শেষ হওয়া দ্বিতীয় বিক্রয়পর্বের আবেদনের ফলাফল ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আবেদনকারীদের জানানো হচ্ছে। এপ্রিল থেকে শুরু হবে চূড়ান্ত ‘লাস্ট-মিনিট’ বিক্রয়পর্ব, যা চলবে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়া পর্যন্ত, এবার বিক্রি হবে ‘আগে এলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে।
ফিফা আরও জানায়, প্রতিটি ম্যাচের ক্ষেত্রে তারা ‘ভ্যারিয়েবল প্রাইসিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করে, যেখানে চাহিদা ও প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে দাম ওঠানামা করে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছে, তারা ‘ডায়নামিক প্রাইসিং মডেল’ প্রয়োগ করে না, অর্থাৎ দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় না।