এ বারের টি-২০ বিশ্বকাপ প্রমাণ করে দিয়েছে, ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে আর দুর্বল বা কমজোরি দল বলে কিছু নেই। নামিবিয়ার অধিনায়ক জেরার্ড ইরাসমাস দাবি করেছেন, তাদের নামের পাশ থেকে ‘সদস্য দেশ’ এবং ‘দুর্বল’ শব্দগুলি মুছে দিতে।
মোট ১১টি পূর্ণ সদস্যের দেশের সঙ্গে নেপাল, যুক্তরাস্ট্র, নেদারল্যান্ডসের মতো সহযোগী সদস্য দেশগুলি দারুন পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছে, যা ক্রিকেটবিশ্বের তথাকথিত শক্তিশালী দেশের সঙ্গে তাদের বিভেদরেখা মুছে দিতে যথেষ্ট। নেপাল ইংল্যান্ডকে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিলো। আমেরিকা যথেষ্ট চাপে ফেলে দিয়েছিল ভারতকে। নেদারল্যান্ডস এবং পাকিস্তানের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিলো স্রেফ একটি ক্যাচ মিস। জিম্বাবুয়ের কাছে ১৯ বছর পরে অস্ট্রেলিয়ার হার গড়েছে নতুন ইতিহাস। ঐতিহাসিক জয়ের পরে অধিনায়ক সিকান্দার রাজা বলেছিলেন, ‘আমরা চাই মানুষ এ বার আমাদের নিয়ে কথা বলুক। আইসিসির প্রতিযোগিতা জীবন বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এখানেই আপনি স্বীকৃতি, অর্থ, সম্মান পান।’
প্রতিযোগিতার সূচি যখন ঘোষণার পরে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞেরাও ধরে নিয়েছিলেন, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলি স্রেফ নিয়মরক্ষার হবে। এক একটা ম্যাচে নাকি ২৫০-৩০০ করে রান হবে। সেই সঙ্গে হবে নাকি একগুচ্ছ বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু তথাকথিত দুর্বল দেশগুলি সব বাধার ঊর্ধ্বে উঠে সাহসী লড়াই করেছে। নেপাল-ইংল্যান্ড লড়াই কোনও প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল না। প্রতিটি বলোলিংয়ে ছিল উত্তেজনা। প্রথম কয়েকটি ম্যাচই গোটা বিশ্বকাপকে জাগিয়ে তুলেছিল। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলিতে কে কোন দিন হেরে যাবে কেউ বুঝতে পারছিল না। টি-২০ বিশ্বকাপ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কেন বিশ্বব্যাপী একটি প্রতিযোগিতা হওয়া দরকার, যেখানে ছোটরাও বড়দের হারিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এডেন মার্করাম বলেছেন, ‘গত দু’বছরে সহযোগী সদস্য দেশগুলোর পারফরম্যান্স আমাদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ওরা বড় মঞ্চে ভাল ক্রিকেট খেলার সাহস পাচ্ছে। কাউকে ভয় পাচ্ছে না।’
অতীতে ছোট দেশগুলির সঙ্গে বড় দেশগুলির খেলার সুযোগ সে ভাবে তৈরি হত না। এমনকি বিশ্বপর্যায়ের ক্রিকেটেও তারা সে ভাবে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেত না। টি-২০ বিশ্বকাপ দু’বছর অন্তর হয়ে যাওয়ায় সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে। তার থেকেও বড় ভূমিকা নিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট। সদস্য দেশগুলির ক্রিকেটারেরা এই সব লীগে খেলেই নিজেদের একটি পরিচিতি তৈরি করে নিয়েছেন। চাপের মুখে ব্যাটিং, বোলিং এখান থেকেই শিখে গিয়েছেন। ফলে বড় মঞ্চে দেশের জার্সিতে নামলে আর অসুবিধা হয় না।
৯টি সহযোগী সদস্য দেশের অধিকাংশই নিজেদের দলেই একাধিক বহিরাগত ক্রিকেটার রেখেছে। অর্থাৎ যাদের জন্ম অন্য দেশে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই উপমহাদেশীয়, অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের ক্রিকেটার। ভারত এবং পাকিস্তানের ক্রিকেটারের সংখ্যাই বেশি। ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা নিজের দেশে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে নিজেদের গড়ে তুলেছেন। তবে দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাজারে সুযোগ না পেয়ে অন্য দেশে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমেরিকার সৌরভ নেত্রাভালকর, হরমীত সিংহ, কানাডার দিলপ্রীত বাজওয়া, নবনীত ধালিওয়াল, অংশ পটেল, ওমানের যতীন্দর সিংহ, আমিরশাহির শোয়েব খান, আলিশান ঘরাফু, আর্যাংশ শর্মা, ইটালির জসপ্রীত সিংহেরা প্রতি ম্যাচেই নিজের দেশের হয়ে সেরাটা দিয়েছেন। আমেরিকার শুভম রঞ্জনে যেমন মুম্বইয়ের হয়ে সূর্যকুমারের সঙ্গে খেলেছেন। ইতালির গ্র্যান্ট স্টুয়ার্ট ক্রিকেটজীবনের বেশিটা কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডে। নেদারল্যান্ডসের রোয়েলফ ফান ডার মারউই বা আমেরিকার আন্দ্রিয়েস গৌস ক্রিকেট খেলেছেন ফাফ ডুপ্লেসি, এবি ডিভিলিয়ার্সের সঙ্গে।
পিছিয়ে নেই কোচেরাও। নেপালকে কোচিং করাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক তারকা স্টুয়ার্ট ল। নামিবিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন গ্যারি কার্স্টেন। আমিরাতের সঙ্গে রয়েছেন লালচাঁদ রাজপুত।
ফুটবল বিশ্বকাপে গত কয়েক দশক ধরে যা দেখা যাচ্ছে, ক্রিকেট বিশ্বকাপে সাম্প্রতিক কালে সেই ধারাই শুরু হয়েছে। ১৯৯০-এ অখ্যাত ক্যামেরুনের কাছে হেরেছিল ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা। এর পর ২০০২-এ সেনেগালের কাছে ফ্রান্সের হার, ২০১৮-য় দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে জার্মানির ছিটকে যাওয়া, ২০২২-এ সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার বুঝিয়েছে, বিশ্বপর্যায়ে কোনও দেশকেই আর হালকা ভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। ক্রিকেটেও ঠিক তাই-ই হচ্ছে। তবে ফুটবলের থেকেও টি-২০ ক্রিকেট বেশি অঘটনপ্রবণ।
পূর্ণ সদস্য দেশগুলি সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। তবে সহযোগী সদস্য দেশগুলিকে যোগ্যতা অর্জন করে, ঘাম ঝরিয়ে বিশ্বকাপে আসতে হয়েছে। যেমন ইটালি হারিয়েছে স্কটল্যান্ডের মতো দেশকে। যোগ্যতা অর্জনের অনেক ম্যাচেই উত্তেজনা, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা গিয়েছে।
তা খেলোয়াড়দের মধ্যে থেকে সেরাটা বার করে আনতে সাহায্য করেছে। তারা বুঝতে পেরেছেন, মুহূর্তের ভুল তাদের নিশ্চিত রোজগার এবং সারাজীবনের স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এই লড়াকু মনোভাব দেখা গিয়েছে মূলপর্বেও। বড় দেশগুলির বাঘা বাঘা ক্রিকেটারকে দেখেও দমে যাচ্ছেন না সদস্য দেশগুলির ক্রিকেটারেরা।
অর্থ-বাণিজ্য: সোনার দাম ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়লো
অর্থ-বাণিজ্য: টানা দরপতনেও বাজার মূলধন বাড়লো হাজার কোটি টাকা