মেয়েদের এশিয়া কাপ ফুটবলে চীনের বিপক্ষে ম্যাচের পর বাংলাদেশ দলের দলের আবহ বলদে গেছে অনেকটাই। উত্তর কোরিয়া ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে পিটার জেমস বাটলারের কথায়ও সে ইঙ্গিত স্পষ্ট। ‘মিলি এলভিস প্রিসলির মতো’, ‘ফেবারিটদের বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলব’, উচ্ছ্বাস ও আত্মবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে কথাগুলো বললেন বাংলাদেশ কোচ।
নারী এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে আজ সিডনির কমব্যাংক স্টেডিয়ামে উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টায় মাঠে গড়াবে ম্যাচটি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল।
শক্তি, সামর্থ্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ফিফা র্যাঙ্কিং- কোথাও উত্তর কোরিয়ার ধারেকাছে নেই বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতার তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়া। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বে নবম, এশিয়ায় দ্বিতীয় দল তারা। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তলানির দিকে, ১১২ তম।
সিডনিতে উজবেকিস্তানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ‘বি’ গ্রুপের পথচলা শুরু করা উত্তর কোরিয়া টেবিলে আছে শীর্ষে। চীনের বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরে আসা বাংলাদেশের অবস্থান তিনে। তবে, চীনের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেই উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলার আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে দল। তবে এখনই কোয়ার্টার-ফাইনালে খেলার বড় স্বপ্ন দেখতে চাইলেন না বাংলাদেশ কোচ। ‘আমরা এখানে আবার এসেছি উত্তর কোরিয়ার মতো খুব-খুব শক্তিশালী একটি দলের মুখোমুখি হতে। তারা টেকনিক্যালি দারুণ দক্ষ এবং সত্যিই খুব প্রতিভাবান দল। আপনি যদি তাদের ফিফা র?্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকান, বুঝতে পারবেন তারাই সম্ভবত এই টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট। তো, শুরুতেই আমরা সব কঠিন প্রতিপক্ষগুলোকে পাচ্ছি, তাই না? চীন এবং এবার কোরিয়া। আমাদের নিজেদের সেরা ছন্দে থাকতে হবে। আমি কোনো ঘোরের মধ্যে নেই; আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ এবং জানি যে অনেক দিক থেকেই এই ম্যাচ জেতাটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ হবে। তবে মূল বিষয় হলো নিজের সেরাটা দেয়া এবং নিজের নিজস্বতা ধরে রাখা।’
‘না, আমি তা মনে করি না ( কোয়ার্টার-ফাইনাল খেলা)। আমি প্রতিটি ম্যাচকে সেভাবেই দেখি, যেভাবে তা সামনে আসে এবং আমি বারবার একই কথা বলতে চাই না। আমরা এখানে আকাশকুসুম কল্পনা নিয়ে আসিনি যে, আমরা বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে যাচ্ছি। আমি এটা ভাবতে চাই যে, প্রতিটি ম্যাচে এই মেয়েরা উন্নতি করবে, তারা শিখবে। এটি তাদের জন্য শেখার একটি সুযোগ। তবে প্রশ্নটি যদি করেন, আমরা পারফরম্যান্স আরও উন্নত করতে পারি? হ্যাঁ, অবশ্যই পারি এবং আমি মনে করি আমরা পারব। আমি শুধু চাই, খেলোয়াড়রা মাঠে গিয়ে তাদের সেরাটা দিক এবং সততা ও নিষ্ঠার সাথে খেলুক।’ চীনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক গোলরক্ষক মিলি আক্তারের। দুইবার পরাস্ত হলেও ম্যাচ জুড়ে ভালো কিছু সেভ করে কোচের আস্থা অর্জন করেছেন এই তরুণ গোলকিপার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই গোলকিপারের প্রশংসা করতে গিয়ে কিংবদন্তি গায়ক এলভিস প্রিসলির চুলের স্টাইলের প্রসংঙ্গও টানলেন বাটলার।
‘মিলি অনেকটা এলভিস প্রিসলির মতো, তার দারুণ একটা স্টাইল আছে। এই টুর্নামেন্টে তার চুলের স্টাইলই সেরা। আজ সকালেও (গতকাল) আমরা এটা নিয়ে কথা বলছিলাম। সে অনেক দিন ধরেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং সে যে আগে খেলেনি, তার একমাত্র কারণ হলো আমাদের কোনো ম্যাচ ছিল না। চীন ম্যাচের আগে প্রায় ৯০ থেকে ১০০ দিন আমাদের কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল না, যা দুর্ভাগ্যজনক।’
‘আমাকে এই সিদ্ধান্তের (রূপনা চাকমার বদলে মিলিকে খেলানো) কোনো কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ফুটবলে গোলকিপিংয়ের জায়গায় বড় সমস্যা আছে, যা নিয়ে কাজ করা দরকার। এটা করা আমার কাজ নয়; আমি যা করতে পারি, তা হলো নতুনদের খুঁজে বের করা এবং মিলির মতো তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার মতো সাহসী হওয়া। সে এই সুযোগ পাওয়ার যোগ্য ছিল; কারণ, তার উচ্চতা আছে, হাত ভালো এবং সে দারুণ একটা চরিত্র। সবচেয়ে বড় কথা, সে একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ থেকে এসেছে; কারণ, সে একজন সৈনিক এবং অনেকেই এই বিষয়টি জানে না।’ প্রতিযোগিতার রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে মাঝমাঠে মনিকা চাকমা ও মারিয়া মান্দা ছিলেন দুর্দান্ত। আক্রমণের সুর খুব একটা বেঁধে দিতে না পারলেও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ রাখার পাশাপাশি রক্ষণে সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুজনের ছিলেন দারুণ। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে দুজনের আক্রমণে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশাও জানিয়ে রাখলেন বাটলার। বৃহস্পতিবার, (০৫ মার্চ ২০২৬) জুবিলি স্টেডিয়ামে অনুশীলনে সেরা একাদশে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেছেন, এমন ইঙ্গিতও দিলেন এই ইংলিশ কোচ।
‘কীভাবে তাদের (মনিকা-মারিয়া) থামানো যায় ভালো প্রশ্ন। শুনুন, আমাদের একটি গেম প্ল্যান আছে এবং আমার মনে হয় আমাদের পরিকল্পনাটি বেশ কার্যকর হবে। দিন শেষে, আমরা শুধু বসে থেকে বিপক্ষ দলের আক্রমণ দেখব না। যদি আমরা গোল খাইও, সেটা হতেই পারে, কিন্তু আমি চাই আমাদের দল রক্ষণাত্মক না হলে অ্যাক্টিভ থাকুক। যখন বল আমাদের দখলে থাকবে, তখন আমরা আক্রমণাত্মক এবং সৃজনশীল থাকব। আর যখন বল থাকবে না, তখন মাঠের জায়গা কমিয়ে রক্ষণভাগকে সুসংহত রাখব। কোরিয়া বা চীনের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে আমাদের খুব সুশৃঙ্খল থাকতে হবে।’
‘হ্যাঁ, কিছু পরিবর্তন থাকবে। আমরা খেলোয়াড়দের কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। আমরা অবশ্যই আজ ম্যাচে একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে চাই, তবে এটাই সব নয়। পার্থে আমাদের তৃতীয় ম্যাচ রয়েছে। তাই কিছু বাধ্যতামূলক পরিবর্তন এবং কৌশলগত পরিবর্তন থাকবে। তবে ম্যাচের দিন সকালের আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না, যদি কেউ চোট পায়। আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে এবং আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি যে আমরা কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই মাঠে নামব না।’
পরিকল্পনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নে আফঈদা খন্দকার কিছু বলার আগেই বাটলার তার কানে কানে বললেন ‘পরিকল্পনার কথা বোলো না।’ কোচের কথা শুনে সতর্ক হলেন অধিনায়ক। ‘কোচের পরিকল্পনাই হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনা। কোচ যেভাবে বলবে আমরা সেভাবেই করব। আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব ভালো খেলার। ম্যাচের ফল তো বলে দেবে বাকিটা।’
অধিনায়কের কথা শেষে বাটলার বললেন, ‘ভালো উত্তর।’ উত্তর কোরিয়াকে সব দিক থেকে এগিয়ে রাখলেও তাদের বিপক্ষে ‘ভালো কিছু’ পাওয়ার আশা ঠিকই দেখছে বাংলাদেশ।
‘আমরা যদি নিজেদের খেলাটা খেলতে পারি, আশা করি, আমরা কিছু মানুষের হৃদয় জয় করতে পারব এবং ভক্তরা আমাদের সমর্থন করা শুরু করবে, যেমনটা তারা আগের রাতে করেছিল। চাইনিজ সমর্থকরা যেভাবে আমাদের খেলাকে সম্মান ও প্রশংসা করেছে, সেটি দারুণ ছিল। আমরা কেবল রক্ষণভাগ সামলে বসে থাকব না, আমরা লড়াই করব। আমি আন্তরিকভাবেই আশা করি, গত ম্যাচের মতো মানসিকতা কালকেও দেখা যাবে।’
‘গত বুধবার খেলোয়াড়দের কিছুটা রিকভারি ডে বা আইসক্রিম ডে ছিল। আমি শুধু আশা করি, তারা একই রকম বিনয় নিয়ে মাঠে নামবে এবং গেম প্ল্যান অনুসরণ করবে। আগের রাতে আমরা হেরেছি, ব্যবধানটা আরও বড় হতে পারত, আবার কমও হতে পারত। ফুটবল পুরোটাই মুহূর্তের খেলা। আমার মনে হয়েছে, আমাদেরও কিছু ভালো মুহূর্ত ছিল এবং উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষেও তেমনটা ঘটবে।’