প্রশ্নবিদ্ধ মানবাধিকার পরিস্থিতি

২০২৫ সালে মবসন্ত্রাস বা গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আসকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর মবসন্ত্রাসে অন্তত ১৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক গুরুতর সতর্কবার্তা।

সন্দেহ, গুজব কিংবা উসকানির ভিত্তিতে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। কোথাও ‘তৌহিদি জনতা’র নামে মব তৈরি করে ভাঙচুর করা হয়েছে। কোথাও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে। এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেয়ার মতো বর্বর ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করেছে।

আসক ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। মবসন্ত্রাসের পাশাপাশি হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে কারাগারে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। থানায় ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটতে দেখা গেছে। এসবই আইনের শাসনের ওপর জনগণের আস্থা আরো দুর্বল করেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রও উদ্বেগজনক। দলীয় সংঘর্ষ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, আহত হয়েছেন হাজার হাজার। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের গণতন্ত্রের সংকট ও সহিংসতার সংস্কৃতিকেই স্পষ্ট করে।

শত শত সাংবাদিক হামলা, হুমকি ও মামলার শিকার হয়েছেন। জাতীয় দৈনিকের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত। একই সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও উপাসনালয় ভাঙচুর সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো সহনশীলতার সংকট, জবাবদিহির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের মনে যে আশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

আমরা বলতে চাই, এ অবস্থায় শুধু উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। মবসন্ত্রাসসহ সব ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধী যে বা যারাই হোক না কেন তাকে বা তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে। নইলে এই সহিংসতা ও অরাজকতা সমাজের ভেতর আরো গভীর শিকড় গেড়ে বসবে। তখন এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।

সম্প্রতি