আজ খ্রিস্টীয় নববর্ষ। কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়ার নাম নববর্ষ নয়। আত্মসমালোচনা, নতুন সংকল্প এবং ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও আজকের দিন। অতীতের ভুল, ব্যর্থতা ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই একটি জাতি সামনে এগোয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
বিদায়ী বছরে আমাদের জাতীয় জীবনে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষকরে দেশে সংঘটিত মব সন্ত্রাস ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অশনিসংকেত। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষোভ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন শুধু ভুক্তভোগীই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। নতুন বছরে এ ধরনের অরাজকতা থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
২০২৬ সাল শুরু হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই শাসনভার হস্তান্তরই গণতন্ত্রের মূল শর্ত। এই নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু হয় সেটা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গণতন্ত্র শুধু ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং সমান অধিকার নিশ্চিত করা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও নানা রূপে বৈষম্য বিদ্যমান। ধর্মের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে, শ্রেণিগত অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য ঘটতে দেখা যায়। এসব বৈষম্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
নতুন বছরে আমাদের প্রয়োজন দৃঢ় জাতীয় ঐক্য। ঐক্য গড়তে সহিংসতা পরিহার করতে হবে, গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার চর্চা করতেহবে। মতভেদ থাকবে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকবে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনোই ঘৃণা, প্রতিশোধ কিংবা সহিংসতায় রূপ না নেয়।
ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র চিন্তাধারার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। ধর্মের নামে রাজনীতি কিংবা সহিংসতাÑউভয়ই মানবতাবিরোধী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যে উদার, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা বাস্তবায়নের দায় আমাদেরই।
খ্রিস্টীয় নববর্ষ আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক নববর্ষ। এই নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে, দেশ হিংসা ও বিদ্বেষের পথ পরিহার করে ন্যায়, সমতা ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে।
২০২৬ সাল সবার জন্য শান্তি, ন্যায় ও গণতন্ত্রের সুসংবাদ বয়ে আনুকÑএই প্রত্যাশাই রইল।